সূর্যের আলো নিষ্প্রভ হবে ও নক্ষত্র খসে পড়বে : একটি পর্যালোচনা

সূর্য ধীরে ধীরে আলো হারিয়ে নিষ্প্রভ হয়ে যাওয়া বা নিভে যাওয়ার বিষয়টি কুরআন, হাদিস এবং আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্যের সাথে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়। নিচে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো: পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাকবীরে মহান আল্লাহ এর স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন: “যখন সূর্য তার আলো হারাবে (বা গুটিয়ে নেওয়া হবে)।” (সূরা আত-তাকবীর: ১)

এখানে আরবি কুয়্যিরাত’ (Kuwwirat) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর শাব্দিক অর্থ হলো কোনো কিছুকে ‘পেঁচানো’ বা ‘গুটিয়ে নেওয়া’ (যেমন মাথার পাগড়ি গোল করে পেঁচানো হয়)। এটি নির্দেশ করে যে, সূর্য একসময় তার চারপাশের বিশাল আলোকচ্ছটা হারিয়ে সংকুচিত বা নিষ্প্রভ হয়ে যাবে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের বর্ণনায় বলেছেন: “কিয়ামতের দিন সূর্য ও চন্দ্রকে নিষ্প্রভ করে পেঁচিয়ে ফেলা হবে (বা আলোহীন অবস্থায় নিক্ষেপ করা হবে)।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩২০০) এই হাদিসটি কুরআনের আয়াতেরই সমর্থন করে এবং জানায় যে, কিয়ামতের সময় মহাজাগতিক এই আলোক উৎসগুলো তাদের কার্যকারিতা হারাবে।

১. বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা (The Life Cycle of the Sun) :

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) অনুযায়ী, সূর্য একটি নক্ষত্র এবং প্রতিটি নক্ষত্রের একটি নির্দিষ্ট আয়ু থাকে। সূর্যের আলো নিষ্প্রভ হওয়ার প্রক্রিয়াটি বিজ্ঞানে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

  • নিউক্লিয়ার ফিউশন বন্ধ হওয়া: সূর্যের শক্তি আসে এর কেন্দ্রের হাইড্রোজেন গ্যাস পুড়ে হিলিয়ামে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে (Nuclear Fusion)। বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যের এই হাইড্রোজেনের ভাণ্ডার অসীম নয়। প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর এই জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে।
  • রেড জায়ান্ট (Red Giant): জ্বালানি শেষ হওয়ার পর্যায়ে সূর্য প্রথমে আকারে অনেক বড় হয়ে যাবে এবং লাল বর্ণ ধারণ করবে। তখন এটি বুধ, শুক্র এমনকি পৃথিবীকেও গিলে ফেলতে পারে।
  • হোয়াইট ডোয়ার্ফ (White Dwarf): লাল দানব হওয়ার পর সূর্যের বাইরের অংশ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়বে এবং এর কেন্দ্রটি সংকুচিত হয়ে একটি ছোট, ঘন এবং অত্যন্ত ক্ষীণ আলোর পিণ্ডে পরিণত হবে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘White Dwarf’।
  • ব্ল্যাক ডোয়ার্ফ (Black Dwarf): কোটি কোটি বছর পর সেই ক্ষীণ আলোটুকুও হারিয়ে সূর্য সম্পূর্ণ কালো ও শীতল একটি বস্তুতে পরিণত হবে। একেই বলা হয় সূর্যের ‘মৃত্যু’ বা পুরোপুরি নিষ্প্রভ হওয়া।
২. সমন্বয় (Symmetry) :

বিজ্ঞান যেটিকে কোটি কোটি বছরের বিবর্তন বা বিয়োজন’ বলছে, কুরআন ও হাদিস সেটিকে কিয়ামতের মহাপ্রলয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। কুরআনের ‘গুটিয়ে নেওয়া’ (Kuwwirat) শব্দটি সূর্যের সংকুচিত হয়ে হোয়াইট ডোয়ার্ফ হওয়ার বৈজ্ঞানিক ধারণার সাথে দারুণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সারসংক্ষেপ:
ধর্মীয় মতে এটি আল্লাহর হুকুমে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘটবে, আর বিজ্ঞানের মতে এটি তার প্রাকৃতিক জ্বালানি শেষ হওয়ার অনিবার্য পরিণতি। উভয় মতেই সত্যটি এক—সূর্য চিরস্থায়ী নয়।

নক্ষত্রের মৃত্যু, সংকোচন এবং মহাকাশের অন্ধকার গহ্বর বা ব্ল্যাক হোল (Black Hole) নিয়ে পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত চমৎকার কিছু ইঙ্গিত রয়েছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের (Astrophysics) আলোকে এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:

৩. নক্ষত্রের পতন ও মৃত্যু :

আল্লাহ তায়ালা শপথ করে বলেছেন: “শপথ নক্ষত্রের, যখন তা পড়ে যায় (অস্তমিত হয় বা বিলীন হয়) (সূরা আন-নাজম: ১)।”

  • বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: এখানে ‘হাওয়া’ (Hawa) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ ওপর থেকে নিচে পড়ে যাওয়া বা ধ্বংস হওয়া। আধুনিক বিজ্ঞান বলে, নক্ষত্র যখন তার জ্বালানি শেষ করে ফেলে, তখন এটি নিজের মহাকর্ষ বলের চাপে নিজের ভেতরেই ভেঙে পড়ে (Gravitational Collapse)। বড় নক্ষত্রগুলো এভাবে ভেঙে পড়লে তা সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটায় অথবা ব্ল্যাক হোল-এ পরিণত হয়।
৪. অদৃশ্য ও সংকুচিত নক্ষত্র :

আল্লাহ বলেন: “আমি শপথ করছি সেই সব নক্ষত্রের, যারা পশ্চাতে ফিরে যায় (পিছু হটে)। যারা চলমান এবং অদৃশ্য (লুকিয়ে যায়)(আত-তাকবীর: ১৫-১৬)।” এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে: আল-খুন্নাস (যা সংকুচিত বা লুকিয়ে যায়), আল-জাওয়ারিল (যা দ্রুত চলমান) এবং আল-কুন্নাস (যা ঝাড়ুদারের মতো সবকিছু পরিষ্কার বা অদৃশ্য করে দেয়)।

  • ব্ল্যাক হোল সংযোগ: বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলকে ঠিক এভাবেই বর্ণনা করেন। এটি একটি মৃত নক্ষত্র যা প্রচণ্ডভাবে সংকুচিত (খুন্নাস), এটি মহাকাশে গতিশীল (জাওয়ারিল) এবং এটি তার চারপাশের সবকিছুকে শক্তিশালী মহাকর্ষ বল দিয়ে নিজের ভেতর টেনে নিয়ে মহাকাশকে পরিষ্কার বা ঝাড়ু (কুন্নাস) দেওয়ার মতো কাজ করে। যেহেতু এর ভেতর থেকে আলোও বের হতে পারে না, তাই এটি অদৃশ্য
৫. মহাকাশের পথ বা বুনন :

আল্লাহ বলেন: “শপথ সুবিন্যস্ত (বুনন বা পথবিশিষ্ট) আকাশের (আজ-যারিয়াত: ৭)।” এখানে ‘হুবুক’ (Hubuk) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ বুনন করা কাপড় বা জালের মতো পথ।

  • মহাকাশ-কাল (Space-Time): আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (Theory of Relativity) অনুযায়ী, মহাকাশ একটি কাপড়ের বুননের মতো (Fabric of Space-time)। বড় কোনো নক্ষত্র বা ব্ল্যাক হোল এই ‘বুনন’-এর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে গর্ত তৈরি করে। কুরআনের এই শব্দটি আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের ‘স্পেস-টাইম ফেব্রিক’-এর ধারণার সাথে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়।
৬. আকাশের বিদীর্ণ হওয়া :

বলা হয়েছে: “যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে (আল-ইনশিকাক: ১)।”

  • বিজ্ঞান: মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে (Expanding Universe)। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এক সময় এই প্রসারণের ফলে মহাকাশের কাঠামোতে ফাটল ধরবে অথবা এটি বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch)-এর মাধ্যমে ধসে পড়বে। নক্ষত্রের মৃত্যু এবং আকাশ বিদীর্ণ হওয়া মূলত একই বিশাল মহাজাগতিক ধ্বংসযজ্ঞের অংশ।

সারসংক্ষেপ:
কুরআন আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে এমন সব শব্দ (যেমন: সংকুচিত হওয়া, আড়ালে চলে যাওয়া, ঝাড়ু দেওয়া) ব্যবহার করেছে যা আজকের ‘ব্ল্যাক হোল’ বা ‘নক্ষত্রের মৃত্যু’র সংজ্ঞার সাথে হুবহু মিলে যায়। এটি প্রমাণ করে যে, এই কিতাব সেই মহান সত্তার পক্ষ থেকে, যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।

সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ-উপগ্রহগুলোর ঘূর্ণন মূলত মহাকর্ষ বল (Gravity) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, চুম্বকীয় আকর্ষণ নয়। তবে মহাকাশে চৌম্বক ক্ষেত্রের একটি ভূমিকা রয়েছে। নিচে এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

৭. ঘূর্ণনের মূল কারণ: মহাকর্ষ (Gravity) :

আইজ্যাক নিউটন এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, সূর্য তার বিশাল ভরের (Mass) কারণে মহাকাশের কাঠামোতে একটি বাঁক বা গর্ত তৈরি করে।

  • কেন ঘোরে: সূর্য গ্রহগুলোকে নিজের দিকে টানছে (Centripetal force), আর গ্রহগুলো তাদের গতির কারণে বাইরের দিকে ছিটকে যেতে চাইছে (Inertia)। এই দুই শক্তির ভারসাম্য গ্রহগুলোকে সূর্যের চারদিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরতে বাধ্য করে।
  • চুম্বকত্বের ভূমিকা: সূর্য এবং গ্রহগুলোর নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field) আছে, কিন্তু তা এতই দুর্বল যে এটি গ্রহগুলোকে কক্ষপথে ধরে রাখার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। চুম্বকত্ব মূলত সৌরঝড় বা অরোরা (Aurora) তৈরির মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে।
৮. এই আকর্ষণ কি ধীরে ধীরে কমে যাবে? :

হ্যাঁ, বৈজ্ঞানিকভাবে এই আকর্ষণ শক্তি ধীরে ধীরে কমার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা অত্যন্ত ধীর প্রক্রিয়ায়। এর কারণগুলো হলো:

  • সূর্যের ভর হ্রাস: সূর্য প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪২ লক্ষ টন পদার্থ শক্তিতে (আলো ও তাপ) রূপান্তর করছে। এর ফলে সূর্যের ভর ধীরে ধীরে কমছে। ভর কমলে তার মহাকর্ষীয় টানও কিছুটা কমে যায়।
  • গ্রহদের দূরত্ব বৃদ্ধি: সূর্যের টান কমে যাওয়ার ফলে গ্রহগুলো (যেমন পৃথিবী) প্রতি বছর সূর্য থেকে সামান্য দূরে সরে যাচ্ছে (পৃথিবীর ক্ষেত্রে এটি বছরে মাত্র ১.৫ সেন্টিমিটার)।
  • জোয়ার-ভাটা বল (Tidal Effects): পৃথিবী থেকে চাঁদও প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার দূরে সরে যাচ্ছে। এটি মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়ার একটি ফল।
৯. চূড়ান্ত পরিণতি: মহাপ্রলয় :

বিজ্ঞানের মতে, কোটি কোটি বছর পর সূর্য যখন ‘রেড জায়ান্ট’ (Red Giant) দশায় পৌঁছাবে, তখন এর ভর এবং আকর্ষণ শক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। তখন কিছু গ্রহ সূর্যের ভেতরে বিলীন হয়ে যাবে, আবার কিছু গ্রহ কক্ষপথ থেকে ছিটকে যেতে পারে।

সারসংক্ষেপ:
গ্রহগুলো ঘোরে মহাকর্ষ বলের কারণে, চুম্বকের কারণে নয়। সূর্যের ভর কমে যাওয়ার সাথে সাথে এই আকর্ষণ শক্তি অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে কমছে, যা সুদূর ভবিষ্যতে সৌরজগতের কাঠামো বদলে দেবে। সূর্যের জ্বালানি শেষ হওয়ার পর সৌরজগৎ এক ভয়াবহ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা একে সূর্যের ‘জীবনচক্রের অন্তিম ধাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এর ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১০. রেড জায়ান্ট (লাল দানব) দশা :

আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্যের কেন্দ্রের হাইড্রোজেন শেষ হয়ে যাবে। তখন সূর্য আকারে বিশাল হয়ে ফুলে উঠবে।

  • গ্রহদের গ্রাস: সূর্যের আকার বর্তমানের চেয়ে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ গুণ বড় হয়ে যাবে। এটি বুধ (Mercury) এবং শুক্র (Venus) গ্রহকে পুরোপুরি গিলে ফেলবে।
  • পৃথিবীর পরিণতি: পৃথিবীও সূর্যের আগুনের শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে অথবা এর কক্ষপথ থেকে দূরে সরে গিয়ে একটি মৃত পাথুরে গ্রহে পরিণত হবে। তখন পৃথিবীতে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে না।
১১. গ্রহরাজদের কক্ষপথ পরিবর্তন :

সূর্য যখন তার বাইরের স্তরগুলো মহাকাশে ছুড়ে দেবে (Planetary Nebula), তখন এর ভর (Mass) অনেক কমে যাবে।

  • আকর্ষণ হ্রাস: সূর্যের ভর কমে যাওয়ায় এর মহাকর্ষীয় টান দুর্বল হয়ে পড়বে। এর ফলে মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনিসহ দূরবর্তী গ্রহগুলো বর্তমান কক্ষপথ ছেড়ে আরও দূরে সরে যাবে। কিছু গ্রহ হয়তো সৌরজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাকাশে হারিয়ে যেতে পারে।
১২. হোয়াইট ডোয়ার্ফ (শ্বেত বামন) :

সূর্যের বাইরের অংশ সরে যাওয়ার পর কেবল এর উত্তপ্ত কেন্দ্রটি অবশিষ্ট থাকবে, যাকে বলা হয় হোয়াইট ডোয়ার্ফ

  • এটি আকারে পৃথিবীর মতো ছোট কিন্তু অত্যন্ত ঘন হবে।
  • এর কোনো নতুন জ্বালানি থাকবে না, তাই এটি কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে ধীরে ধীরে তার অবশিষ্ট তাপ বিকিরণ করবে এবং একসময় পুরোপুরি শীতল ও অন্ধকার হয়ে যাবে (যাকে বলা হয় Black Dwarf)।
১৩. অন্ধকার সৌরজগৎ :

সূর্য যখন আলোহীন হয়ে পড়বে, তখন অবশিষ্ট গ্রহগুলো (যদি টিকে থাকে) এক প্রচণ্ড শীতল এবং অন্ধকার পরিবেশে ভাসতে থাকবে। সেখানে আর কোনো দিন-রাত বা ঋতু পরিবর্তন হবে না।

কুরআনের সাথে সংযোগ: কুরআনের সূরা তাকবীরের সেই বর্ণনা—“যখন সূর্য তার আলো হারাবে”—বিজ্ঞানের এই ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ বা ‘ব্ল্যাক ডোয়ার্ফ’ হওয়ার প্রক্রিয়ার সাথে হুবহু মিলে যায়। বিজ্ঞান যাকে প্রাকৃতিক নিয়ম বলছে, ইসলাম তাকেই বলছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত কিয়ামত বা মহাপ্রলয়। কিয়ামতের সময় নক্ষত্র খসে পড়া এবং সমুদ্র ফেটে যাওয়ার বিষয়টি কুরআন, হাদিস এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ‘মহাজাগতিক বিপর্যয়’ (Cosmic Catastrophe) তত্ত্বের সাথে দারুণভাবে মিলে যায়। নিচে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

১৪. নক্ষত্র খসে পড়া (Stars Falling) :

কুরআনের বর্ণনা: আল্লাহ বলেন, যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে।” (সূরা তাকবীর: ২)। এখানে ‘ইনকাদারাত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ আলোহীন হওয়া বা কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে ঝরে পড়া।

  • হাদিসের ব্যাখ্যা: রাসুল (সা.) কিয়ামতের আলামত হিসেবে আকাশ ফেটে যাওয়া এবং নক্ষত্রগুলোর শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ার কথা বলেছেন।
  • বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: মহাবিশ্ব বর্তমানে প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু এক সময় এই প্রসারণ থেমে গিয়ে যদি সংকোচন শুরু হয় (Big Crunch), তবে নক্ষত্রগুলো তাদের কক্ষপথের ভারসাম্য হারিয়ে একে অপরের ওপর আছড়ে পড়বে। এছাড়া কোনো বড় নক্ষত্র যখন জ্বালানি হারিয়ে বিস্ফোরিত হয় (Supernova), তখন তার ধ্বংসাবশেষ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে, যা দূর থেকে নক্ষত্র খসে পড়ার মতো দেখায়।
১৫. সমুদ্র ফেটে যাওয়া বা উত্তাল হওয়া (Oceans Boiling/Bursting) :

কুরআনের বর্ণনা: আল্লাহ বলেন, যখন সমুদ্রসমূহকে উত্তাল করে তোলা হবে (বা আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে)।” (সূরা তাকবীর: ৬) এবং যখন সমুদ্রসমূহ ফেটে পড়বে (বা মিশে এক হয়ে যাবে)।” (সূরা ইনফিতার: ৩)।

  • ইসলামিক ব্যাখ্যা: মুফাসসিরগণ বলেন, কিয়ামতের সময় সমুদ্রের তলদেশ ফেটে যাবে এবং মিষ্টি ও নোনা পানি মিশে একাকার হয়ে যাবে। অনেক বর্ণনায় আছে, সমুদ্রের পানি শুকিয়ে সেখানে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলবে।
  • বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
    • টেকটনিক প্লেট: সমুদ্রের তলদেশে বিশাল বিশাল আগ্নেয়গিরি ও টেকটনিক প্লেট রয়েছে। কিয়ামতের প্রচণ্ড ভূমিকম্পে এই প্লেটগুলো ফেটে গেলে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা বা লাভা বের হয়ে আসবে, যা সমুদ্রের পানিকে ফুটিয়ে বাষ্প করে দেবে (Boiling Oceans)।
    • পানির উপাদান: পানি হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন দিয়ে তৈরি, যা উভয়ই অত্যন্ত দাহ্য। প্রচণ্ড তাপে পানির অণু ভেঙে গেলে সমুদ্র আক্ষরিক অর্থেই আগুনের কুণ্ডলী’-তে পরিণত হতে পারে।
১৬. আকাশ বিদীর্ণ হওয়া (Sky Ripping) :

কুরআনের বর্ণনা: যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে।” (সূরা ইনশিকাক: ১)।

  • বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে ‘The Big Rip’ নামক একটি তত্ত্ব আছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি যদি অসীম হয়ে যায়, তবে একসময় মহাকাশের কাঠামো (Space-time fabric) আর টিকে থাকতে পারবে না এবং আক্ষরিক অর্থেই তা ছিঁড়ে বা ফেটে যাবে।

সারসংক্ষেপ:
কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত এই ধ্বংসলীলা বিজ্ঞানের ভাষায় মহাবিশ্বের ‘এনট্রপি’ (Entropy) বা চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার বহিঃপ্রকাশ। যা আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ওহীর মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছিল।

আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে স্রষ্টার সৃষ্টির কলাকৌশল বুঝা অতিব কঠিন। কেননা সৃষ্টি স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণাধীন এবং জ্ঞান অতিব সসীম। পক্ষান্তওর স্রষ্টা নিয়ন্ত্রণহীন এবং জ্ঞান অসীম ও মহাজ্ঞানী। পরিশেষে আল্লাহু ‘আলাম। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তার দ্বীনের উপর অবিচল রেখে মুমিন হিসেবে কবূলিয়াত মৃত্যু দান করুন এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত রাখুন এই কামনা করি, আমীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loader-image

Scroll to Top