আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য অস্ত যাবার সময় আবূ যার (রাঃ)-কে বললেন, তুমি কি জানো, সূর্য কোথায় যায়? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, তা যেতে যেতে আরশের নীচে গিয়ে সাজ্দাহয় পড়ে যায়। অতঃপর সে আবার উদিত হবার অনুমতি চায় এবং তাকে অনুমতি দেয়া হয়। আর শীঘ্রই এমন সময় আসবে যে, সিজ্দা করবে কিন্তু তা কবূল করা হবে না এবং সে অনুমতি চাইবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেয়া হবে না। তাকে বলা হবে, যে পথ দিয়ে আসলে ঐ পথেই ফিরে যাও। তখন সে পশ্চিম দিক হতে উদিত হয়— এটাই মর্ম হল মহান আল্লাহর বাণীরঃ ’’আর সূর্য নিজ গন্তব্যে (অথবা) কক্ষ পথে চলতে থাকে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ’ (বুখারী হা/৩১৯৯ ও ৪৮০২)।
সারসংক্ষেপ :: এই হাদিসে হযরত আবু যার (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, সূর্যাস্তের সময় নবী করীম (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করেন, “সূর্য কোথায় যায় তুমি কি জান?” আবু যার (রা.) উত্তর দেন, “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন নবী (সা.) বলেন, সূর্য গিয়ে আরশের নিচে সিজদা করে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায়।
: এটি পবিত্র কুরআনের সূরা ইয়াসীনের ৩৮ নম্বর আয়াতের ( আর সূর্য তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে চলে ) ব্যাখ্যা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিসেও আরশের নিচে সূর্যের সিজদা করা এবং কিয়ামতের আগে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার সেই ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
মূল বিষয়সমূহ:
আরশের নিচে সিজদা: সূর্য প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর মহান আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে এবং পরের দিন পুনরায় উদিত হওয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে।
পশ্চিম আকাশে সূর্যোদয়: কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে একদিন সূর্যকে পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না, বরং যেখান থেকে এসেছে সেখানে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। তখন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে।
ঈমানের দরজা বন্ধ: সূর্য যখন পশ্চিম দিক থেকে উঠবে, তখন আর কারও তওবা বা ঈমান গ্রহণ করা হবে না।
সহীহ বুখারীর এই হাদিসটি মূলত একটি আধিভৌতিক (Metaphysical) বা আধ্যাত্মিক বিষয়ের বর্ণনা। এটি বিজ্ঞান বনাম ধর্মের দ্বন্দ্ব নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ। এর ব্যাখ্যাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রেক্ষাপট (Context) :
হাদিসটির মূল উদ্দেশ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য দেওয়া নয়, বরং মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রকাশ করা। সূর্য একটি জড় বস্তু হলেও স্রষ্টার অনুগত। ‘সিজদা করা’ বা ‘অনুমতি নেওয়া’ বলতে বোঝানো হয়েছে যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু আল্লাহর বেঁধে দেওয়া নিয়ম বা প্রাকৃতিক আইনের (Laws of Nature) অধীন। সূর্য তার কক্ষপথে চলা মানেই আল্লাহর ইবাদত করা।
২. বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও সমন্বয় :
বিজ্ঞানের ভাষায় পৃথিবী তার অক্ষের ওপর ঘোরে বলেই আমরা দিন-রাত বা সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখি। হাদিসের বর্ণনাকে আধুনিক জ্ঞান দিয়ে বিশ্লেষকরা কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করেন:
- সবসময় সূর্যাস্ত ও সিজদা: পৃথিবীতে প্রতি মূহূর্তে কোথাও না কোথাও সূর্যাস্ত হচ্ছে। সেই হিসেবে সূর্য সবসময়ই আল্লাহর আরশের নিচে সিজদাবনত অবস্থায় আছে। আরশ পুরো মহাবিশ্বকে ঘিরে রেখেছে, তাই সূর্য মহাবিশ্বের যেখানেই থাকুক, তা আল্লাহর আরশের নিচেই থাকে।
- পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়: আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী, পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি বা ‘রোটেশন’ যদি কোনো কারণে উল্টে যায় (যাকে Retrograde Rotation বলা হয়), তবে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোনো বড় মহাজাগতিক সংঘর্ষ বা চৌম্বকীয় পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে এমনটা হওয়া তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব।
- ভিন্ন মাত্রা: হাদিসের ‘সিজদা’ আমাদের দৃশ্যমান জগতের বাইরের কোনো বিষয় হতে পারে (Ghaib বা অদৃশ্য)। এটি সূর্যের রূহ বা আধ্যাত্মিক সত্তার কাজ, যা টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা সম্ভব নয়।
৩. রূপক অর্থ (Metaphorical view) :
অনেক ইসলামিক স্কলার মনে করেন, এখানে সূর্যকে মানুষের মতো বর্ণনা করা হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ স্রষ্টার ক্ষমতা বুঝতে পারে। সূর্য স্বাধীন নয়, বরং প্রতিদিন আল্লাহর হুকুমে উদিত হয়—এই সত্যটি বোঝানোই হাদিসের মূল লক্ষ্য।
সূর্য প্রতিদিন আরশের নিচে সিজদা করে—বুখারীর এই হাদিসটির ব্যাখ্যায় আধুনিক মুসলিম স্কলার এবং বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেছেন। নিচে প্রধান কয়েকটি ব্যাখ্যা দেওয়া হলো: [1]
১. ড. জাকির নায়েকের ব্যাখ্যা (বিজ্ঞান ও যুক্তি) :
ড. জাকির নায়েক এই হাদিসটিকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমন্বয় করে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে:
- সর্বদা প্রবহমান সূর্য: বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে যে সূর্য স্থির নয়, বরং এটি তার নিজস্ব কক্ষপথে গ্যালাক্সির চারপাশে অবিরাম ঘুরছে।
- অদৃশ্য সিজদা: সিজদা করা মানে কেবল কপালে ঠেকানো নয়, বরং আল্লাহর আইনের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। সূর্য যেহেতু আল্লাহর বেঁধে দেওয়া নিয়ম (Laws of Physics) মেনে সবসময় চলছে, তাই সে প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর কাছে নতজানু।
- আরশের বিশালতা: যেহেতু আল্লাহর আরশ পুরো মহাবিশ্বকে পরিবেষ্টন করে আছে, তাই সূর্য মহাবিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, তা সবসময় আরশের নিচেই অবস্থান
২. আধুনিক মুফাসসিরদের রূপক ব্যাখ্যা (Metaphorical View) :
অনেক আধুনিক আলেম মনে করেন, এই হাদিসটি সাধারণ মানুষকে মহাজাগতিক বিষয়ের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এক ধরনের রূপক (Metaphor) হিসেবে বলা হয়েছে-
- দৃষ্টিভ্রম ও বাস্তবতা: আমরা যখন পৃথিবী থেকে সূর্যাস্ত দেখি, তখন সূর্য আমাদের চোখের আড়ালে চলে যায়। হাদিসে একে ‘চলে যাওয়া’ এবং ‘সিজদা করা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে যাতে মানুষ বোঝে যে সূর্য কোনো স্বাধীন দেবতা নয়, বরং আল্লাহর হুকুমের গোলাম।
- অন্য মাত্রার ঘটনা: কিছু স্কলার বলেন, সূর্যের এই সিজদা করা একটি ‘গায়েবি’ বা অদৃশ্য জগতের বিষয়। এটি আমাদের সাধারণ ত্রিমাত্রিক বিজ্ঞানের (Physics) বিষয় নয়, বরং আধ্যাত্মিক জগতের সত্য।
৩. মহাজাগতিক পরিবর্তন ও পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় :
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও (Astronomers) তাত্ত্বিকভাবে স্বীকার করেন যে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হতে পারে-
- পৃথিবীর ঘূর্ণন: বর্তমানে পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরছে। যদি কোনো বড় মহাজাগতিক বিপর্যয়ের কারণে এই ঘূর্ণন বিপরীতমুখী হয়ে যায়, তবে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে। হাদিসে এই বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার কথাই কিয়ামতের ১০টি বড় নিদর্শনের একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
- স্থির কক্ষপথ: কুরআনে বলা হয়েছে, “সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলছে” (সূরা ইয়াসীন: ৩৮)। আধুনিক বিজ্ঞানও স্বীকার করে যে সূর্যের গতিপথ বা ‘Solar Apex’ একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখী।
৪. ইমামগণের মতামত (ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট) :
ইমাম খাত্তাবী (র.)-এর মতো প্রাচীন বিদ্বানরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, ‘সিজদা’ মানে কেবল সেজদাই নয়, বরং সূর্যের ইবাদতকারী মুশরিকদের এই বার্তা দেওয়া যে—সূর্য নিজেই আল্লাহর কাছে নতজানু। সুতরাং সূর্যের পূজা করা অর্থহীন।
সারসংক্ষেপ: আধুনিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হাদিসটি মূলত সূর্যের প্রাকৃতিক গতি এবং আল্লাহর ইচ্ছার কাছে তার পূর্ণ বশ্যতা প্রকাশ করে। বিজ্ঞানের সাথে এর কোনো সরাসরি সংঘর্ষ নেই, কারণ এটি একটি আধ্যাত্মিক সত্যকে মানুষের সহজবোধ্য ভাষায় বর্ণনা করেছে।
সূর্য এবং মহাকাশ নিয়ে বুখারীর হাদিসটির মূল প্রতিপাদ্য পবিত্র কুরআনের বেশ কিছু আয়াতের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। আধুনিক বিজ্ঞান এই আয়াতগুলোর চমৎকার ব্যাখ্যা প্রদান করে। নিচে প্রধান কয়েকটি সংযোগ দেওয়া হলো:
১. সূর্যের নির্দিষ্ট গন্তব্য :
কুরআনে বলা হয়েছে: “আর সূর্য তার নির্ধারিত গন্তব্যের (মুস্তাকার) দিকে চলছে।”(সূরা ইয়াসীন: ৩৮)।
- হাদিসের সাথে মিল: বুখারীর ৪৮০২ নম্বর হাদিসে এই আয়াতেরই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, সূর্য প্রতিদিন আরশের নিচে তার ‘গন্তব্যে’ পৌঁছে সিজদা করে।
- বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: অতীতে মনে করা হতো সূর্য স্থির। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) প্রমাণ করেছে যে, সূর্য তার পুরো পরিবার (সৌরজগৎ) নিয়ে মহাকাশে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৫০ কিমি বেগে ‘সোলার অ্যাপেক্স’ (Solar Apex) নামক একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর দিকে ছুটে চলছে। একেই বিজ্ঞানে সূর্যের ‘Orbit’ বা কক্ষপথ বলা হয়।
২. কক্ষপথে সাঁতার কাটা :
আল্লাহ বলেন: “তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ; সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ (সাঁতার কাটা) করছে।” (সূরা আম্বিয়া: ৩৩)।
- বৈজ্ঞানিক সংযোগ: এখানে ‘ইয়াসবাহুন’ (সাঁতার কাটা) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেন যে মহাকাশে গ্রহ-নক্ষত্রগুলো কোনো শক্ত ভিত্তির ওপর নয়, বরং শূন্যে ভাসমান অবস্থায় ঘূর্ণায়মান, যা অনেকটা পানির ওপর সাঁতার কাটার মতো। হাদিসে সূর্যের যে প্রতিদিনের চলার কথা বলা হয়েছে, তা এই কক্ষপথের নিরবচ্ছিন্ন গতিরই অংশ।
৩. সূর্য ও চাঁদের হিসাব :
কুরআনে বলা হয়েছে: “সূর্য ও চন্দ্র নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী চলে।”(সূরা আর-রহমান: ৫)।
- বৈজ্ঞানিক সংযোগ: সূর্য প্রতিদিন ঠিক কখন উদিত হবে এবং কখন অস্ত যাবে, তা গাণিতিকভাবে নিখুঁত। হাদিসে ‘অনুমতি নেওয়া’ বলতে এই সুশৃঙ্খল প্রাকৃতিক নিয়মকেই বোঝানো হয়েছে। যদি একদিন এই ‘হিসাব’ বা আল্লাহর দেওয়া নিয়ম ওলটপালট হয় (যেমন পৃথিবীর ঘূর্ণন উল্টে যাওয়া), তবেই সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে।
৪. সিজদার সর্বজনীনতা :
আল্লাহ বলেন: “তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আসমানসমূহে ও যমীনে—সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি, পাহাড়-পর্বত, বৃক্ষলতা ও জীবজন্তু…(সূরা হাজ্জ: ১৮)”
- ব্যাখ্যা: এই আয়াতটি হাদিসের সেই ‘সিজদা’র বিষয়টি পরিষ্কার করে। সিজদা কেবল মানুষের কপালে ঠেকানো নয়, বরং মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণু আল্লাহর বেঁধে দেওয়া পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র (Laws of Physics) মেনে চলা মানেই হলো তাকে সিজদা করা। সূর্য তার কক্ষপথ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হয় না—এটাই তার সিজদা।
৫. কিয়ামতের মহাজাগতিক পরিবর্তন :
বলা হয়েছে: “যখন সূর্য তার আলো হারাবে (গুটিয়ে নেওয়া হবে)।” (সূরা তাকবীর: ১)
- বৈজ্ঞানিক সংযোগ: বিজ্ঞানীরা বলেন, কয়েক বিলিয়ন বছর পর সূর্যের জ্বালানি (Hydrogen) শেষ হয়ে যাবে এবং এটি একটি ‘Red Giant’ বা সবশেষে ‘White Dwarf’-এ পরিণত হবে। হাদিসে বর্ণিত পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় এবং আলোর পরিবর্তন মূলত মহাবিশ্বের সেই চূড়ান্ত বিপর্যয়েরই ইঙ্গিত।
সারসংক্ষেপ:
কুরআন ও হাদিস মূলত একই সত্যকে দুইভাবে উপস্থাপন করে। কুরআন বলছে সূর্য একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক পথে চলছে, আর হাদিস বলছে এই চলার প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের (সিজদা) নামান্তর।
আপনি কি পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় হওয়ার বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা (যেমন: Magnetic Pole Reversal) সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চান?
পশ্চিমে সূর্যোদয় হওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণসমূহ :
বিজ্ঞানীরা ‘পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়’ হওয়ার বিষয়টিকে মূলত পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির পরিবর্তন বা বিপর্যয়ের সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করেন। এর পেছনে প্রধান দুটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা সম্ভাবনা আলোচনা করা হয়:
১. চৌম্বক মেরু পরিবর্তন (Magnetic Pole Reversal) :
পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু স্থির নয়। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, পৃথিবীর ইতিহাসে অনেকবার এই চৌম্বক মেরু একে অপরের জায়গা বদল করেছে (Geomagnetic Reversal)।
- প্রক্রিয়া: পৃথিবীর কেন্দ্রের গলিত লোহা ও নিকেলের প্রবাহের কারণে এই চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। যদি এই প্রবাহে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসে, তবে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র উল্টে যেতে পারে।
- প্রভাব: কম্পিউটার মডেল অনুযায়ী, চৌম্বক মেরু উল্টে যাওয়ার সময় পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে বা তাত্ত্বিকভাবে বিপরীতমুখী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যার ফলে সূর্যকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হতে দেখা যেতে পারে।
২. রেট্রোগ্রেড রোটেশন (Retrograde Rotation) :
জ্যোতির্বিজ্ঞানে কোনো গ্রহ যদি তার স্বাভাবিক ঘূর্ণনের উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে, তাকে ‘রেট্রোগ্রেড মোশন’ বলে।
- উদাহরণ: আমাদের সৌরজগতের শুক্র (Venus) এবং ইউরেনাস (Uranus) গ্রহ বর্তমানে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘোরে (রেট্রোগ্রেড)। অর্থাৎ, শুক্র গ্রহে সূর্য পশ্চিম দিকে ওঠে এবং পূর্ব দিকে অস্ত যায়।
- পৃথিবীর ক্ষেত্রে: পৃথিবী বর্তমানে ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে (Counter-clockwise) ঘুরছে। যদি কোনো বিশাল মহাজাগতিক বস্তু (যেমন বড় কোনো গ্রহাণু বা নিবিরু সদৃশ কিছু) পৃথিবীকে প্রচণ্ড বেগে আঘাত করে বা খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করে, তবে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি থেমে গিয়ে উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করতে পারে। তখন পৃথিবী থেকেও সূর্যকে পশ্চিম দিকে উঠতে দেখা যাবে।
৩. টাইডাল লকিং ও ঘূর্ণন হ্রাস (Earth’s Rotation Slowing) :
চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি প্রতি শতাব্দীতে কয়েক মিলিসেকেন্ড করে কমছে। তাত্ত্বিকভাবে, কোনো এক সময় পৃথিবী পুরোপুরি থেমে যেতে পারে। থেমে যাওয়ার পর পুনরায় যদি কোনো মহাজাগতিক শক্তির প্রভাবে এটি ঘুরতে শুরু করে এবং দিক পরিবর্তন হয়, তবে হাদিসের সেই বর্ণনাটি বাস্তব রূপ নিতে পারে।
৪. আইটিসিজেড (ITCZ) এবং জলবায়ু মডেল :
কিছু আধুনিক গবেষক মনে করেন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বা চৌম্বকীয় স্তরে বড় ধরনের পরিবর্তনের ফলে আলোক প্রতিসরণ (Refraction) এমনভাবে হতে পারে যে সূর্যকে পশ্চিম দিকে দেখা যাবে, যদিও এটি একটি দুর্বল তত্ত্ব।
সারসংক্ষেপ:
বিজ্ঞান বলছে যে পৃথিবীর ঘূর্ণন উল্টে যাওয়া অসম্ভব নয়, তবে এটি একটি মহাপ্রলয় বা ক্যাটাস্ট্রফিক ইভেন্ট হবে। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, যখন এটি ঘটবে তখন পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে, যা কিয়ামতের ঠিক আগের মুহূর্তের সাথে হুবহু মিলে যায়।
আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে স্রষ্টার সৃষ্টির কলাকৌশল বুঝা অত্যন্ত কঠিন। কেননা সৃষ্টি স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণাধীন এবং জ্ঞান অতিব সসীম। পক্ষান্তওর স্রষ্টা নিয়ন্ত্রণহীন এবং জ্ঞান অসীম ও মহাজ্ঞানী। পরিশেষে আল্লাহু ‘আলাম। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তার দ্বীনের উপর অবিচল রেখে মুমিন হিসেবে কবূলিয়াত মৃত্যু দান করুন এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত রাখুন এই কামনা করি, আমীন।

























