স্বামীর আনুগত্য

দাম্পত্য জীবনে সুখের মূল ভিত্তি হল একজন স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি সদা অনুগত থাকবে। শারঈ নির্দেশনা অনুসারে স্ত্রী যদি স্বামীর অনুগত থাকে তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে জীবন হবে সুখোময়। আল্লাহ স্বামীকে পরিবার প্রধান বানিয়েছেন, পরিবারের পরিচালনা ও দায় তার উপরেই ন্যস্ত করেছেন। আর স্ত্রীকে বানিয়েছে সহকর্মী, সহযোগী। তাই স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর একান্ত কর্তব্য। আর এ কর্তব্য পালনে সম্মান-অসম্মানের কিছু নেই।

স্ত্রীদের জন্য জান্নাত অতিব সহজলভ্য যদি ৫টি বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করে। এমর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا وَصَامَتْ شَهْرَهَا وَحَفِظَتْ فَرْجَهَا وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا قِيلَ لَهَا ادْخُلِى الْجَنَّةَ مِنْ أَىِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شِئْتِ، ‘নারী যদি তার পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করে, রামাযান মাসের ছিয়াম রাখে, স্বীয় লজ্জাস্থান হেফাযত করে এবং নিজ স্বামীর আনুগত্য করে, তাহ’লে তাকে বলা হবে, জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ কর’(আহমাদ হা/১৬৬১)।

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের পরে স্বামীর আনুগত্য। স্বামীর আনুগত্য করার অর্থ হচ্ছে, তিনি যা আদেশ করবেন তা পালন করা এবং যা নিষেধ করবেন তা থেকে বিরত থাকা। তবে শারঈ বিধানের পরিপন্থী কোন বিধান পালন করবেন না। যেমন- শিরক-বিদআত করার আদেশ দিলে তা পালনীয় হবে না।

মূল বিষয়সমূহ: ইসলামে স্বামীর আনুগত্য বলতে বোঝায় দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে তার বৈধ ও শরীয়তসম্মত আদেশ-নির্দেশে সম্মান ও সমর্থন জানানো। এই আনুগত্য অন্ধভাবে মেনে নেওয়া নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, এবং আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।  নিচে তা সংক্ষেপে বলা হলো-

পারিবারিক কাঠামো ও নেতৃত্ব: ইসলামে স্বামীকে পরিবারের কর্তা বা দায়িত্বশীল হিসেবে গণ্য করা হয়েছে (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৪)। এই কাঠামোগত শৃঙ্খলার জন্য স্ত্রীর আনুগত্য অপরিহার্য, যা পরিবারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

শরীয়তসম্মত বিষয়ে আনুগত্য: স্ত্রীর আনুগত্য কেবল বৈধ বা ‘হালাল’ (halal) কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। স্বামী যদি কোনো ‘হারাম’ (forbidden) বা অনৈসলামিক কাজ করার নির্দেশ দেন, তবে স্ত্রী তা মানতে বাধ্য নন। আল্লাহ্‌র আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে কোনো মানুষের আদেশ মানা যাবে না।

পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য: আনুগত্যের পাশাপাশি স্বামীরও স্ত্রীর প্রতি অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, যেমন স্ত্রীর ভরণপোষণ করা, তার সাথে সদয় আচরণ করা এবং সম্মান প্রদর্শন করা। বৈবাহিক সম্পর্ক হলো পারস্পরিক ভালোবাসা, মমতা এবং বোঝাপড়ার সম্পর্ক (সূরা রুম, ৩০:২১)।

পরকালীন পুরস্কার: হাদীসে বর্ণিত আছে, যে নারী তার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, তার সতীত্ব রক্ষা করে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করে, সে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে।

পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ: যদিও স্বামীকে প্রধান দায়িত্বশীল বলা হয়েছে, ইসলাম দাম্পত্য জীবনে পরামর্শের (শূরা) গুরুত্ব দেয়। গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সিদ্ধান্তে স্বামী-স্ত্রী আলোচনা করে থাকেন। 

সার-সংক্ষেপে, স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর জন্য একটি ধর্মীয় কর্তব্য, তবে তা অবশ্যই ইসলামী শরীয়তের সীমার মধ্যে হতে হবে এবং এটি পারিবারিক সুখ ও শৃঙ্খলার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

স্বামীর আনুগত্যের গুরুত্ব :

নারী-পুরুষের মধ্যে দায়িত্বশীল হলো পুরুষ। কর্তার আদেশ নিষেধ প্রতিপালন করা উচিৎ ততক্ষণ যতক্ষণ না শারঈ বিধানের পরিপন্থী হয়। পুরুষ সদা নারীর উপর নেতৃত্ব দিবে। আর নারী হবে পুরুষের পরামর্শক। আর নারী-পুরুষের অধিকার সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ‘আর নারীদের জন্য রয়েছে বিধি মোতাবেক অধিকার, যেমন আছে তাদের ওপর (পুরুষদের) অধিকার’ (বাক্বারাহ ২/২২৮)। অপর আয়াতে তিনি বলেন,الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ ‘পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক’ (নিসা ৪/৩৪)। মুসলিম নারীর উপরে স্বামীর আনুগত্য করা ওয়াজিব। আর অবাধ্য হওয়া হারাম। আব্দুল্লাহ বিন আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) ইরশাদ করেন,لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَّسْجُدَ لِغَيْرِ اللهِ لَأَمَرْتُ الْـمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا، وَالَّذِيْ نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا تُؤَدِّيْ الْـمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤَدِّيَ حَقَّ زَوْجِهَا كُلِّهِ، حَتَّى لَوْ سَأَلَـهَا نَفْسَهَا وَهِيَ عَلَى قَتَبٍ لَمْ تَمْنَعْهُ، ‘আমি যদি কাউকে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য সিজদা করতে আদেশ করতাম তাহ’লে নারীকে তাঁর স্বামীর জন্য সিজদা করতে আদেশ করতাম। কারণ সে সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! কোন মহিলা নিজ প্রভুর অধিকার আদায় করেছে বলে ধর্তব্য হবে না যতক্ষণ না সে তার স্বামীর অধিকার আদায় করে। এমনকি কোন মহিলাকে তার স্বামী সহবাসের জন্য ডাকলে তাতে তার অস্বীকার করার কোন অধিকার নেই। যদিও সে তখন উটের পিঠে আরোহী অবস্থায় থাকুক না কেন’ (আহমাদ ৪/৩৮১)।

অন্যত্র এসেছে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ، وَلَا تَأْذَنَ فِي بَيْتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ، ‘কোন নারীর পক্ষে বৈধ নয় স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত ছিয়াম রাখা। আর স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি দিবে না’(বুখারী হা/৪৮৯৯; মুসলিম হা/১০২৬)।

অপর হাদীছে এসেছে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ، فَلَمْ تَأْتِهِ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ، ‘স্বামী যখন তার স্ত্রীকে বিছানায় আহবান করে, কিন্তু সে ডাকে সাড়া না দেয়। ফলে সে তার ওপর রাগান্বিত হয়ে রাত যাপন করে, তাহ’লে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা ঐ নারীর ওপর লানত করতে থাকে’([ বুখারী হা/৩০৬৫; মুসলিম হা/১৪৩৬)।

অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُو امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهَا، فَتَأْبَى عَلَيْهِ، إِلَّا كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ سَاخِطًا عَلَيْهَا حَتَّى يَرْضَى عَنْهَا، ‘যার হাতে আমার জীবন সে সত্ত্বার কসম! যে কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে বিছানায় আহবান করে, কিন্তু সে প্রত্যাখ্যান করে, তাহ’লে আসমানে বিদ্যমান সত্ত্বা (অর্থাৎ আল্লাহ) অবশ্যই তার ওপর রাগান্বিত থাকেন, যতক্ষণ না স্বামী তার স্ত্রীর ওপর সন্তুষ্ট হয়’(মুসলিম হা/১৭৩৬)

শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللهُ، ‘সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হেফাযতকারিণী ঐ বিষয়ে যা আল্লাহ হেফাযত করেছেন’ (নিসা ৪/৩৪) এ আয়াতের দাবী অনুযায়ী স্ত্রীর ওপর স্বামীর আনুগত্য করা ওয়াজিব, সেটি তার সাথে সফর হোক, তার সাথে আনন্দ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয় হোক বা অন্য যে কোন চাহিদা হোক। এ কথা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাতও প্রমাণ করে(ইবনে তাইমিয়াহ, মাজমূউল ফাৎওয়া ৩২/২৬০-২৬১০)।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) উল্লেখ করেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ‘আর নারীদের জন্য রয়েছে বিধি মোতাবেক অধিকার, যেমন আছে তাদের ওপর (পুরুষদের) অধিকার’ (বাক্বারাহ ২/২২৮)। অপর আয়াতে তিনি বলেন,الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ ‘পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক’ (নিসা ৪/৩৪)। যদি নারী পুরুষের সেবা না করে, বরং পুরুষ নারীর সেবা করে, তাহ’লে নারী তত্ত্বাবধায়ক হবে পুরুষের উপর…। অতঃপর বলেন, সন্দেহ নেই আল্লাহ স্বামীর ওপর স্ত্রীর খরচ, পোষাক ও বাসস্থানের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তাকে ভোগ করা, তার খেদমত গ্রহণ করা ও বিধি মোতাবেক তার সেবার বিনিময়ে। অধিকন্তু মানুষের সাধারণ লেনদেন ও চুক্তিগুলো সমাজে প্রচলিত বিধি ও নীতির ওপর ভিত্তি করেই হয়, (অতএব, বিয়ে পরবর্তী স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও সে নীতি মোতাবেক হবে এটিই স্বাভাবিক)। প্রচলিত নীতি হচ্ছে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর খেদমত করা ও তার ঘরের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া। তিনি আরো বলেন, এক্ষেত্রে সম্ভ্রান্ত ও সাধারণ, ধনী ও গরীবের মাঝে বিভাজন করা দুরস্ত নয়। দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তম নারী ফাতেমা (রাঃ)ও স্বামীর খিদমত করতেন। তিনি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে সাংসারিক কাজের অভিযোগ করলে তিনি সে অভিযোগ আমলে নেননি’ (ইবনুল কাইয়্যিম, হাদইউন নববী ৫/১৮৮-১৮৯)।

স্বামীর অনুগত স্ত্রী জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, وَنِسَاؤُكُمْ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ الْوَدُوْدُ الْعَؤُوْدُ عَلَى زَوْجِهَا، الَّتِي إِذَا غَضِبَ جَاءَتْ حَتَّى تَضَعَ يَدَهَا فِيْ يَدِهِ، ثُمَّ تَقُولُ: لاَ أَذُوْقُ غَمْضًا حَتَّى تَرْضَى- ‘তোমাদের জান্নাতী রমণীগণ হচ্ছে যারা স্বামীর প্রতি প্রেমময়ী ও স্বামীর নিকটে বারবার আগমনকারিণী। স্বামী ক্রদ্ধ হ’লে সে এসে স্বামীর হাতে হাত রেখে বলে, আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাব না’(বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৮৩৫৮)।

উম্মুল হুছাইন বিন মিহছান তার ফুফু থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তার কোন প্রয়োজনে রাসূল (ছাঃ)-এর দরবারে গমন করেন। তার প্রয়োজন শেষ হ’লে রাসূল (ছাঃ) বললেন, তুমি কি বিবাহিতা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসূল (ছাঃ) বললেন, তুমি তার (স্বামীর) জন্য কেমন? তিনি বললেন, আমি অক্ষম না হওয়া পর্যন্ত তার সেবা করি। রাসূল (ছাঃ) বললেন, انْظُرِىْ أَيْنَ أَنْتِ مِنْهُ فَإِنَّهُ جَنَّتُكِ وَنَارُكِ- ‘লক্ষ্য কর, তার থেকে তুমি কোথায় (তার হক্ব আদায়ের ক্ষেত্রে)? কেননা সে তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম’ (মুসনাদ আহমাদ হা/২৭৩৯২; ছহীহুল জামে‘ হা/১৫০৯)।

এই হ’ল ইসলামের শিক্ষা। স্ত্রীর প্রতি ইসলামের নির্দেশনা। এই ইলাহী নির্দেশ ও নববী নির্দেশনা মেনে চললে সংসার হবে জান্নাতের টুকরা সদৃশ। সুখের স্নিগ্ধতা ঝরে ঝরে পড়বে পরিবারে। ফুটন্ত গোলাপের মত সুরভিত হয়ে উঠবে দাম্পত্য জীবন। তাই স্বামীর ঘরে পাঠানোর পূর্বেই মায়েরা স্বীয় কন্যাদের মনে করিয়ে দিতেন এ মূল্যবান নির্দেশনা। কন্যার প্রতি এমন বহু আলোকিত নছীহতে ভরপুর হয়ে আছে ইতিহাসের পাতা। আওফ আশ-শায়বানীর মেয়ের বিয়ে হ’লে স্বামীর হাতে মেয়েকে তুলে দেয়ার মুহূর্তে মা উমামা বিনতে হারেছ মেয়েকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলেন, মেয়ে আমার! যে ঘরে তুমি বেড়ে উঠেছ, খুশি ও আনন্দে যাকে ভরে রেখেছ সে ঘর ছেড়ে অপরিচিত ঘরে অপরিচিত একজন মানুষের কাছে তুমি যাচ্ছ। জীবনের এ গুরুতবপূর্ণ সময়ে আমার কয়েকটি নছীহত মনে রেখ। এগুলো তোমার সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। (তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য নছীহত ছিল) স্বামী তোমাকে কোন আদেশ করলে কখনো তা অমান্য করবে না এবং তার ব্যক্তিগত কোন কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করবে না। …মনে রাখবে, নিজের চাওয়া ও চাহিদার উপর স্বামীর চাওয়া ও চাহিদাকে প্রাধান্য না দেওয়া পর্যন্ত তুমি কখনো তার মন জয় করতে পারবে না। তুমি যদি তার দাসী হও তাহ’লে সে তোমার দাস হবে (মুহাম্মাদ ইবুন ইবরাহীম ইবনে ইবরাহীম ইবনে হাস্সান, দুরুস লিশ-শায়খ মুহাম্মাদ হাস্সান, ৪৩/১২পৃঃ; আবদে রাবিবহী, আল-ইকদুল ফারীদ, ৩/১৯১; আল-মুসতাতরাফ, ২/১৮৪)।

স্বামীর আনুগত্যের উদাহরণ :

(১) কাযী শুরাইহ বলেন, বিয়ের রাতে স্ত্রী আমাকে বলল, আমি একজন অপরিচিত নারী। আপনার চাওয়া-পাওয়া ও পসন্দ-অপসন্দ কিছুই আমার জানা নেই। তাই আপনার পসন্দনীয় বিষয়গুলো বলুন যেন আমি তা পালন করতে পারি। আর অপসন্দনীয় বিষয়গুলোও বলুন যেন সেগুলো থেকে বিরত থাকতে পারি। কাযী শুরাইহ তার পসন্দ-অপসন্দের বিষয়গুলো জানান। তার স্ত্রী সেগুলো এতটা যত্নের সাথে মেনে চলতেন যে, কাযী শুরাইহ বলেন,فلبثت معي عشرين سنةً وما بكتت عليها في تلك السنين إلا يوماً واحداً كنت لها، ‘বিশ বছর সে আমার সঙ্গে ছিল। কিন্তু এই দীর্ঘ বছরে কোন কারণে আমি তার প্রতি রাগ করতে পারিনি। তবে একবার ব্যতীত, আর সেবারও আমি তার প্রতি অন্যায় করেছিলাম’ (ইবনু আসাকির (মৃঃ ৫৭১হিঃ), তারীখু দিমাশক, (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ, ১৪১৫ হিঃ/১৯৯৫ খ্রিঃ), ২৩/৫৩, ৫৫/৮৯)। এটা আনুগত্যেরই ফল। এর দ্বারা স্বামী যেমন নিজের ভুল ও অন্যায় স্বীকার করবে তেমনি স্ত্রীকে প্রাণ উজাড় করে ভালবাসবে, তার জন্য কুরবান হবে। ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন,أَقَامَت أم صَالح معي عشْرين سنة فَمَا اخْتلفت أَنا وَهِي فِي كلمة ‘আমার সাথে উম্মু ছালেহ বিশ বছর অবস্থান করেছে, একটি কথায়ও আমি ও সে মতভেদ করিনি’(আবুল হুসাইন ইবনু আবী ইয়া‘লা, ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ, (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ, তাবি), ১/৪২৯; আবু ইসহাক বুরহানুদ্দীন, আল-মুক্বতাছিদুল এরশাদ ফী যিকরি আছহাবি ইমাম আহমাদ, (রিয়াদ : মাকতাবাতুর রাশিদ, ১ম প্রকাশ, ১৪১০ হিঃ/১৯৯০ খ্রিঃ), ২/২৮৯)

(২) আবুবকর (রাঃ)-এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রাঃ)। মৃত্যুর সময় আবুবকর (রাঃ) স্ত্রীকে অছিয়ত করে বলেছিলেন, আমি মৃত্যুবরণ করলে তুমিই আমাকে গোসল দেবে। তবে সেদিন ছিয়াম অবস্থায় থাকলে ছিয়াম ভেঙ্গে ফেলবে। কেননা ছিয়াম রেখে গোসল দেওয়া ও মৃত্যুপরবর্তী শোকপরিস্থিতি সামলানো কষ্টকর হবে। অতঃপর আবুবকর (রাঃ) মৃত্যুবরণ করলে আসমা (রাঃ) তাকে গোসল দেন। সেদিন তিনি ছিয়াম রেখেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুপরবর্তী শোকের পরিবেশ ও বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে ছিয়াম ভাঙ্গার কথা ভুলে যান। আবুবকর (রাঃ)-এর দাফনের পর দিনের শেষে তার মনে পড়ে তখন তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। দিন প্রায় শেষ ইফতারের সময় সমাগত। এ অল্প সময়ের জন্য ছিয়াম ভেঙ্গে ফেলবেন? কিন্তু ছিয়াম না ভাঙ্গলে তো স্বামীর কথাও মানা হবে না। স্বামীর আনুগত্য করা হবে না। তাই স্বামীর কথা মত দিন শেষ হয়ে এলেও তিনি ছিয়াম ভেঙ্গে ফেলেন (আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সা‘দ (মৃঃ ২৩০হিঃ), ত্বাবাক্বাতুল কুবরা, (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪১০ হিঃ/১৯৯০ খ্রিঃ), ৩/১৫১-৫২)

 (৩) ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান। ওমর ইবনে আব্দুল আযীযের স্ত্রী। তিনিও একজন খলীফার স্ত্রী। পৃথিবীর ইতিহাসে বিরলতম সৌভাগ্যের অধিকারিণী একজন নারী। তার পিতা ছিলেন খলীফা, স্বামী ছিলেন খলীফা এবং চার ভাইও ছিলেন খলীফা। তার চার ভাই একের পর এক খলীফা হয়েছেন। পরম আদর-সোহাগে লালিত-পালিত এ মহিলার বিয়েও হয়েছে মহা ধুমধামের সাথে। পিতা তৎকালীন খলীফা আব্দুল মালিক স্বর্ণ-গহনা, হিরা-জহরতের ভান্ডার যেন উজাড় করে দিয়েছিলেন মেয়ের বিয়েতে। তবে ওমর বিন আব্দুল আযীয যখন খলীফা হন তখন স্ত্রীকে সমুদয় গহনা বায়তুল মালে জমা দিতে বলেন। ফাতেমা (রহঃ) স্বামীর কথা মত সবকিছু বায়তুল মালে জমা দেন। ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) যখন মারা যান তখন তার স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য কোন সম্পদ ছিল না। তার ভাই ইয়াযীদ ইবনে আব্দুল মালেক যখন ওমর ইবনে আব্দুল আযীযের মৃত্যুর পর খলীফা হন তখন বোনকে বায়তুলমাল থেকে তার সমুদয় স্বর্ণ-গহনা ফিরিয়ে দিতে চাইলেন। তিনি তখন বললেন, এসব আমীরুল মুমিনীনের কথা মত বায়তুলমালে দান করে দিয়েছি, فما كنت لأطيعه حيا وأعصيه ميتاً ‘আমি জীবিতাবস্থায় তার আনুগত্য করে মৃত্যুর পর তার অবাধ্য হ’তে পারব না’(যয়নাব বিনতু আলী ফাওয়ায আল-আমেলী (মৃঃ ১৩৩২ হিঃ), আর্দ্দুরুল মানছূর ফী ত্বাবাক্বাতি রিবাতিল খুদূর, (মিশর : মাতবা‘আতুল কুবরা আল-আমীরিয়াহ, ১ম প্রকাশ, ১৩১২হিঃ), পৃঃ ৩৬৬।)  যখন তার অর্থের অত্যধিক প্রয়োজন ছিল তখনও তিনি মহা মূল্যবান সম্পদ ফিরিয়ে দিচ্ছেন কেবল স্বামীর আনুগত্যের জন্য।

পরিশেষে, স্বামীর আনুগত্য পিতা-মাতার আনুগত্যের উর্ধ্বে। প্রথমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য ফরয। এর পরে স্বামীর, যদি স্বামী মুমিন মুসলমান হয়ে থাকেন। প্রকাশ থাকে যে, স্বামী-স্ত্রী দুজনের মধ্যে একজন সালাত আদায় করেন অপরজন বিরত থাকেন এমন পরিবারে আনুগত্যের প্রয়োজন নেই। কেননা সালাত অস্বীকারকারী কাফের। আর কাফেরের সাথে অটোমেটিক বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে থাকে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন আমীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loader-image

Scroll to Top