মু‘আমালাত ও মু‘আশারাত সম্পর্কে ধারনা

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ প্রত্যেক মানুষকেই একে অপরের পরিপূরক করে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদত যেমন সালাত, সিয়াম, যাকাত ও হজ্জের বিধান ইসলাম দিয়েছে, তেমনি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের মানুষের সঙ্গে আচরণের জন্যও সুস্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করেছে। ইসলামী শরিয়তের এই সামাজিক ও পারস্পরিক আচরণসংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হলো- মু‘আমালাত (المعاملات)মু‘আশারাত (المعاشرات)

(ক) মু‘আমালাত বলতে সাধারণত মানুষের পারস্পরিক লেনদেন ও অধিকার-সম্পর্কিত বিষয় বোঝায়।যেমন ক্রয়-বিক্রয়, ঋণ, আমানত, অংশীদারি, চুক্তি, ভাড়া, শ্রমিকের অধিকার ইত্যাদি।

(খ) মু‘আশারাত বলতে মানুষের সঙ্গে বসবাস ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উত্তম আচরণ বোঝায়—যেমন পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, প্রতিবেশীর হক আদায়, অতিথিকে সম্মান, সত্য কথা বলা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, ক্ষমা ও উত্তম চরিত্র অবলম্বন করা।

ইসলাম শুধু মসজিদে ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং বাজারে সততা, পরিবারে কোমলতা, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ এবং মানুষের অধিকার রক্ষাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১. মু‘আমালাতের পরিচয় :

আরবি মু‘আমালাত’ (المعاملات) শব্দটি মু‘আমালাহ’ (المعاملة)-এর বহুবচন। এর অর্থ পারস্পরিক লেনদেন, আচরণ ও কার্যসম্পাদন।

ইসলামী পরিভাষায় মু‘আমালাত বলতে মানুষের পারস্পরিক অধিকার ও লেনদেনের এমন বিধানকে বোঝায়, যার মাধ্যমে সম্পদ, চুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য পারস্পরিক বিষয় ন্যায় ও শরিয়তের বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

ইসলাম মানুষের সম্পদকে সম্মান দিয়েছে এবং অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ  “হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে তা বৈধ” (আন-নিসা, ৪:২৯)।

এই আয়াত মু‘আমালাতের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে—অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণ করা যাবে না এবং বৈধ লেনদেনে পারস্পরিক সম্মতি থাকতে হবে।

২. অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ নিষিদ্ধ :

অন্যের সম্পদ চুরি, প্রতারণা, আত্মসাৎ, ঘুষ, জালিয়াতি এবং অন্যের অধিকার অন্যায়ভাবে দখল করার মতো কাজ অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন-وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ  “তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং জেনেশুনে মানুষের সম্পদের কোনো অংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পৌঁছিয়ে দিও না” (আল-বাকারা, ২:১৮৮)। অতএব একজন মুসলিম ব্যবসায়ী কিংবা কর্মজীবী ব্যক্তির জন্য শুধু সালত-সিয়ামে যথেষ্ট নয়; তার উপার্জনও হতে হবে হালাল ও ন্যায়সংগত

৩. ব্যবসায় সততা ও প্রতারণা বর্জন :

ব্যবসায়িক প্রতারণার ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। কোনো পণ্যের ত্রুটি গোপন করা, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে বিক্রি করা, ওজনে কম দেওয়া বা ক্রেতাকে ভুল তথ্য দেওয়া ইসলামী মু‘আমালাতের পরিপন্থী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন  مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنِّي  “যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়” (মুসলিম হা/১০২)।

৪. ব্যবসায় নম্রতা ও উদারতা :

ইসলাম শুধু প্রতারণা থেকে বাঁচতে বলেনি; বরং ব্যবসায় সদাচরণ ও নম্রতা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, رَحِمَ اللَّهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ، وَإِذَا اشْتَرَى، وَإِذَا اقْتَضَى “আল্লাহ এমন ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যে বিক্রি করার সময়, ক্রয় করার সময় এবং নিজের পাওনা দাবি করার সময় নম্রতা অবলম্বন করে” (বুখারি, হা/২০৭৬)। অর্থাৎ ইসলামি ব্যবসায়ের আদর্শ হলো—সততা, স্বচ্ছতা, নম্রতা ও ন্যায়পরায়ণতা।

৫. মু‘আশারাতের পরিচয় :

মু‘আশারাত (المعاشرات) শব্দটি মু‘আশারাহ’ (المعاشرة) থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো মানুষের সঙ্গে একত্রে বসবাস করা, মেলামেশা করা এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা।

ইসলামী মু‘আশারাতের মধ্যে রয়েছে—

  • পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ
  • আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা
  • প্রতিবেশীর অধিকার আদায়
  • অতিথিকে সম্মান করা
  • বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ভালো আচরণ
  • দুর্বল ও দরিদ্রদের সাহায্য করা
  • মানুষের সম্মান রক্ষা করা
  • গীবত ও অপবাদ থেকে বেঁচে থাকা
  • কাউকে কথা বা কাজের মাধ্যমে কষ্ট না দেওয়া
  • ক্ষমা, ধৈর্য ও নম্রতা অবলম্বন করা

৬. পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ :

আল্লাহ তাআলা বলেন, وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا  “এবং পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো।” একই আয়াতে আল্লাহ তাআলা আত্মীয়স্বজন, এতিম, দরিদ্র, নিকট ও দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী ও পথিকের প্রতিও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো- আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশের পরই মানুষের অধিকার ও সদাচরণের কথা এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক উভয়েরই গুরুত্ব অপরিসীম।

৭. প্রতিবেশীর অধিকার :

মু‘আশারাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একত্র করেছে—ভালো কথা বলা, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ এবং অতিথির সম্মান। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।” একই হাদীসে তিনি আরও বলেছেন  فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ “সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।” এবং فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ   “সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে” (মুসলিম, হা/৪৭)।

৮. মানুষের প্রতি কষ্ট না দেওয়া :

প্রকৃত মুসলিম হওয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অন্য মানুষের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা করা। কারও বিরুদ্ধে কটু কথা বলা, অপমান করা, গালি দেওয়া, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া কিংবা শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়া সবই ইসলামী মু‘আশারাতের পরিপন্থী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ “মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে” (বুখারী হা/১০)।

৯. অন্যের জন্য নিজের মতো কল্যাণ কামনা :

ইসলামী সামাজিক নীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। মানুষের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা দূর করে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহযোগিতা সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে” (বুখারী হা/১৩)।

১০. মুমিনদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব :

কোনো মুসলিমের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা বাড়িয়ে দেওয়া নয়; বরং সম্ভব হলে মীমাংসা ও সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন,  إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ “মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমাদের প্রতি রহমত করা হয়” (হুজুরাত, ৪৯:১০)।

১১. কথা বলার ক্ষেত্রে ইসলামের নীতি :

মানুষের অধিকাংশ সম্পর্ক নষ্ট হয় জিহ্বার অপব্যবহারের কারণে। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ  “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।” (মুসলিম হা/৪৭)। এই নীতি পরিবার, বন্ধুত্ব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

১২. মু‘আমালাত ও মু‘আশারাতের পারস্পরিক সম্পর্ক :

মু‘আমালাত ও মু‘আশারাতকে সম্পূর্ণ পৃথক করে দেখা ঠিক নয়। বরং উভয়ই ইসলামের সামগ্রিক নৈতিক ব্যবস্থার অংশ।

উদাহরণস্বরূপ—

ব্যবসায় সততা হলো মু‘আমালাতের বিষয়, কিন্তু ক্রেতার সঙ্গে ভদ্র ও নম্র আচরণ মু‘আশারাতের বিষয়।

ঋণ পরিশোধ করা মু‘আমালাতের বিষয়, কিন্তু ঋণগ্রহীতার অসুবিধা বুঝে সহানুভূতিশীল হওয়া মু‘আশারাতের বিষয়।

চুক্তি রক্ষা করা মু‘আমালাতের বিষয়, কিন্তু অপর পক্ষের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ মু‘আশারাতের বিষয়।

অর্থাৎ ইসলামের আদর্শ হলো—লেনদেনে ন্যায় এবং সম্পর্কে সৌজন্য যথাযথভাবে রক্ষা করা।

১৩. আধুনিক জীবনে মু‘আমালাত ও মু‘আশারাত :

বর্তমান যুগে এই নীতিগুলোর গুরুত্ব আরও বেশি।

(ক) ব্যবসায় :

  • পণ্যের প্রকৃত মান প্রকাশ করা।
  • ভেজাল না দেওয়া।
  • ওজনে কম না দেওয়া।
  • মিথ্যা বিজ্ঞাপন না দেওয়া।
  • ক্রেতাকে প্রতারণা না করা।
  • চুক্তির শর্ত পালন করা।

(খ) চাকরি ও কর্মক্ষেত্রে :

  • দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।
  • অফিসের সম্পদ আত্মসাৎ না করা।
  • সহকর্মীর অধিকার নষ্ট না করা।
  • সময়ের ব্যাপারে আমানতদার হওয়া।
  • কর্মচারীর ন্যায্য পাওনা প্রদান করা।

(গ) পরিবারে :

  • পিতা-মাতাকে সম্মান করা।
  • স্ত্রী-স্বামীর অধিকার আদায় করা।
  • সন্তানদের সঙ্গে কোমল আচরণ করা।
  • আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।
  • পারিবারিক বিরোধে ন্যায়পরায়ণ থাকা।

(ঘ) সমাজে :

  • প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেওয়া।
  • দরিদ্র ও অসহায়কে সাহায্য করা।
  • মানুষের সম্মান রক্ষা করা।
  • গীবত ও অপবাদ থেকে বেঁচে থাকা।
  • ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসার চেষ্টা করা।

(ঙ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে :

মু‘আশারাতের নীতিগুলো অনলাইনেও প্রযোজ্য। তাই-

  • যাচাই না করে সংবাদ ছড়ানো যাবে না।
  • কাউকে অপমান করা যাবে না।
  • গীবত বা অপবাদ প্রচার করা যাবে না।
  • অশালীন ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।
  • অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা যাবে না।

কারণ মাধ্যম পরিবর্তিত হলেও মানুষের অধিকার পরিবর্তিত হয় না।

১৪. মু‘আমালাত ও মু‘আশারাতের কয়েকটি মৌলিক নীতি :

ইসলামী শিক্ষা থেকে নিম্নলিখিত নীতিগুলো পাওয়া যায়-

প্রথমত, সততা: জীবনের সকল ক্ষেত্রে মিথ্যা ও প্রতারণা বর্জন করা। কেননা, মিথ্যা সকল পাপের মূল।

দ্বিতীয়ত, আমানতদারি: অন্যের সম্পদ, দায়িত্ব ও গোপনীয়তা রক্ষা করা।কেননা যার আমানতদারিতা নেই তার ঈমান নেই।

তৃতীয়ত, ন্যায়পরায়ণতা: নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। ন্যায়-নীতি জীবনে না থাকলে সে জীবন বিশৃংখল জীবনে পরিণত হয়।

চতুর্থত, পারস্পরিক সম্মতি: বৈধ লেনদেন জবরদস্তির মাধ্যমে নয়, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে, হওয়া।

পঞ্চমত, উত্তম চরিত্র:

কথা ও কাজে মানুষের প্রতি সদাচরণ করা।উত্তম চরিত্রবান ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর এই সকল ব্যক্তি প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখে।

ষষ্ঠত, অন্যের ক্ষতি না করা: জিহ্বা, হাত, অর্থ, ক্ষমতা কিংবা কোনো মাধ্যম দিয়ে অন্যের ওপর জুলুম না করা। যারা গীবত-তহমত দিয়ে মানুষের মান সম্মান নষ্ট করে তারা সূদের মধ্যে গণ্য হবে। কিয়ামতের মাঠে এ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

সপ্তমত, ক্ষমা ও নম্রতা: মানুষের সঙ্গে কঠোরতা নয়; বরং সামর্থ্য অনুযায়ী নম্রতা ও ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করা। যার মধ্যে কোমলতা ও ক্ষমার মত মহৎ গুণ নেই সে প্রকৃত মুমিন নয়।

শরী‘আতের দিক-নির্দেশনা অনুসারে ইসলাম উত্তম আচরণকে উৎসাহিত ও মন্দ আচরণকে নিরুৎসাহিত করেছে। উত্তম আচরণের উপদেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا ‘তোমরা মানুষের সাথে উত্তম কথা বল’ (বাক্বারাহ ২/৮৩)

 লোকমান স্বীয় সন্তানকে মু‘আশারাতের সুন্দর উপদেশ দিয়েছিলেন। যা মহান আল্লাহর কাছে পসন্দনীয় হওয়ার এটি কুরআনে উল্লেখ করে দিয়েছেন। লোকমান স্বীয় সন্তানকে বলেছিলেন,وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ، وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِير- ‘আর তুমি মানুষের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর যমীনে অহংকার করে চলাফেরা কর না; নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে পসন্দ করেন না। আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, তোমার গলার আওয়ায নীচু কর; নিশ্চয়ই সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হল গাধার ডাক’ (লোকমান ৩১/১৮-১৯)।  

নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম-মিসকীনদের সাথে সদাচরণের উপদেশ দিয়ে তিনি বলেন, وَإِذَا حَضَرَ الْقِسْمَةَ أُولُو الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينُ فَارْزُقُوهُمْ مِنْهُ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا ‘আর যদি বণ্টনে নিকটাত্মীয় এবং ইয়াতীম ও মিসকীনরা উপস্থিত হয়, তাহ’লে তোমরা তাদেরকে তা থেকে প্রদান করবে এবং তাদের সাথে উত্তম কথা বলবে’ (নিসা ৪/৮)

মু‘আমালাত ও মু‘আশারাতের সীমালংঘন যেন মামুলি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। হাশরের ময়দানের নিদারুণ চিত্র আমাদের হৃদয়ে রেখাপাত করে না। অথচ এক্ষেত্রে সীমালংঘনের কারণে কতইনা করুণ পরিণতির সম্মুখীন হ’তে হবে। সুতরাং পারস্পরিক সদাচরণের গুরুত্ব দিয়ে এক মুমিন অপর মুমিনের সাক্ষাৎ হলে মুচকি হাসা, উত্তম কথা বলা, অপর ভাইয়ের সহযোগিতায় হাত বাড়িয়ে দেওয়া সবই কল্যাণকর এবং ছাদাক্বার নেকীর সমপর্যায়ের। এক মুসলমান অপর মুসলমান থেকে নিরাপদ থাকবে, একজনের ব্যথায় আরেকজন সমব্যথী হবে, এক মুসলিম ভাই অপর মুসলিম ভাইয়ের কষ্ট দূর করে দিবে এটাই দ্বীনের শিক্ষা। আবূ যার (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ، وَأَمْرُكَ بِالمَعْرُوفِ وَنَهْيُكَ عَنِ المُنْكَرِ صَدَقَةٌ، وَإِرْشَادُكَ الرَّجُلَ فِي أَرْضِ الضَّلَالِ لَكَ صَدَقَةٌ، وَبَصَرُكَ لِلرَّجُلِ الرَّدِيءِ البَصَرِ لَكَ صَدَقَةٌ، وَإِمَاطَتُكَ الحَجَرَ وَالشَّوْكَةَ وَالعَظْمَ عَنِ الطَّرِيقِ لَكَ صَدَقَةٌ، وَإِفْرَاغُكَ مِنْ دَلْوِكَ فِي دَلْوِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ- ‘তোমার ভাইয়ের সামনে তোমার হাসি ছাদাক্বা। সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজের নিষেধ করাও ছাদাক্বা, পথ হারানো ব্যক্তিকে পথ দেখিয়ে দেওয়াও ছাদাক্বা, দৃষ্টিহীনকে পথ দেখানোও ছাদাক্বা, রাস্তা থেকে পাথর, কাটা, হাড্ডি সরিয়ে ফেলাও তোমার জন্য ছাদাক্বা, তোমার বালতি থেকে তোমার ভাইয়ের বালতিতে পানি ঢেলে দেওয়াও তোমার জন্য ছাদাক্বা স্বরূপ’ (তিরমিযী হা/১৯৫৬; সিলিসিলা ছহীহাহ হা/৫৭২)। অন্যত্র তিনি বলেন, كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ، وَإِنَّ مِنَ المَعْرُوفِ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طَلْقٍ، وَأَنْ تُفْرِغَ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَاءِ أَخِيكَ ‘প্রত্যেক ভাল কাজই ছাদাক্বাহ। তোমার ভাইয়ের সাথে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা এবং তোমার বালতির সাহায্যে (কুয়ো থেকে পানি তুলে) তোমার ভাইয়ের পাত্র ভরে দেওয়াও ছাদাক্বার পর্যায়ভুক্ত’(তিরিমিযী হা/১৯৭০; মিশকাত হা/১৯১০, সনদ ছহীহ)।

ইসলাম মানুষের জীবনকে শুধু ইবাদতের মাধ্যমে সুন্দর করতে চায়নি; বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককেও সুন্দর করতে চেয়েছে। একজন ব্যক্তি যত বেশি নামাজ পড়ুক, কিন্তু যদি সে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করে, ব্যবসায় প্রতারণা করে, পিতা-মাতার অবাধ্য হয়, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় কিংবা মানুষের সম্মান নষ্ট করে—তাহলে তার ইসলামী চরিত্রে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়।

অন্যদিকে একজন সত্যিকারের মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হলো- সে আল্লাহর হক আদায় করার পাশাপাশি বান্দার হকও রক্ষা করবে। তার ব্যবসায় থাকবে সততা, লেনদেনে থাকবে আমানতদারি, কথায় থাকবে সত্য ও সৌন্দর্য, পরিবারে থাকবে ভালোবাসা, প্রতিবেশীর সঙ্গে থাকবে সদাচরণ এবং সমাজে থাকবে ন্যায় ও সহযোগিতা।

অতএব বলা যায়, মু‘আমালাত মানুষের সম্পদ ও অধিকারকে সুরক্ষিত করে, আর মু‘আশারাত মানুষের হৃদয় ও সামাজিক সম্পর্ককে সুন্দর করে।

ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য উভয়টিরই প্রয়োজন। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মু‘আমালাত ও মু‘আশারাত বাস্তবায়িত হলে ব্যক্তি হবে সৎ, পরিবার হবে শান্তিময়, ব্যবসা হবে স্বচ্ছ এবং সমাজ হবে ন্যায়, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক ভালোবাসায় সমৃদ্ধ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে উত্তম মু‘আমালাত ও সুন্দর মু‘আশারাতের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

loader-image

Scroll to Top