আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিকুলের তাক্বদীর লিখিত করে রেখেছেন। আর ফায়সালাতে এ কথা নির্ধারিত হয়ে আছে যে, কিছু মানুষ জান্নাত ও কিছু মানুষ জাহান্নামের অধিকারী হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামকে মানুষ ও জীন দ্বারা পরিপূর্ণ করা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, اِلَّا مَنۡ رَّحِمَ رَبُّكَ ؕ وَ لِذٰلِكَ خَلَقَهُمۡ ؕ وَ تَمَّتۡ كَلِمَۃُ رَبِّكَ لَاَمۡلَـَٔنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الۡجِنَّۃِ وَ النَّاسِ اَجۡمَعِیۡنَ ‘তবে তোমার প্রতিপালক যাদের প্রতি দয়া করেন তারা (মতবিরোধ করবে) না। এই উদ্দেশ্যেই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আর তোমার প্রতিপালকের এ বাণী পূর্ণ হবেই যে, আমি জাহান্নামকে জ্বিন আর মানুষ দিয়ে অবশ্য অবশ্যই ভরে দেব‘ (হুদ ১১/১১৯)।
জান্নাত দুঃখ-কষ্ট দ্বারা এবং জাহান্নাম কু-প্রবৃত্তির চাদর দ্বারা আবৃত করা হয়েছে। যার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করা কঠিন ও কষ্টকর হবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করা সহজ লোভ্য হবে। দুনিয়া বিমুখ ব্যক্তিরা আখেরাতের প্রতি যত্নশীল হতে গিয়ে দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জণ দিয়ে দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়। অপরদিকে দুনিয়ার প্রতি যত্নশীল ব্যক্তি আখেরাতকে ক্ষতিগ্রস্থ করে প্রবৃত্তি অনুসারে দুনিয়ার লোভ-লালসার প্রতি মোহগ্রস্থ হয়। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করার পর জিবরীল (আঃ)-কে জান্নাতের দিকে পাঠিয়ে দিয়ে বলেন, জান্নাত এবং আমি এর মধ্যে জান্নাতীদের জন্য যেসব দ্রব্যাদি সৃষ্টি করে রেখেছি, তুমি সেগুলো দেখে এসো। তিনি বলেনঃ তারপর তিনি জান্নাতে গিয়ে আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টিকৃত সমস্ত দ্রব্যাদি দেখলেন এবং তার নিকট ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের শপথ! যে কেউ জান্নাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ প্রসঙ্গে শুনবে, সে-ই তাতে প্রবেশের চেষ্টা করবে।
তারপর তিনি আদেশ করলেন। ফলে কষ্ট-মুসীবাতের বস্তু দ্বারা জান্নাতকে ঘেরাও করা হলো। তিনি জিবরীল (আঃ)-কে পুনরায় বললেনঃ তুমি আবার জান্নাতে প্রবেশ কর এবং জান্নাতীদের জন্য আমার তৈরিকৃত সামগ্ৰী দেখে এসো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর তিনি সেখানে ফিরে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, তা কষ্ট ও মুসীবাতের বস্তু দ্বারা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। তিনি আল্লাহ তা’আলার নিকট ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের শপথ! আমার ভয় হচ্ছে যে, এতে কোন ব্যক্তিই যেতে পারবে না।
এবার আল্লাহ তা’আলা তাকে বললেনঃ আমি জাহান্নাম এবং জাহান্নামীদের জন্য যে আযাব তৈরী করে রেখেছি তুমি গিয়ে তা দেখে এসো। তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, এর একাংশ অন্য অংশের উপর চড়াও হচ্ছে (একটি অন্যটিকে গ্রাস করছে)। তিনি তা দেখার পর আল্লাহ তা’আলার সামনে ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের শপথ! যে ব্যক্তি এর বর্ণনা শুনবে সে এতে প্রবেশ করবে না। তারপর তার নির্দেশে জাহান্নামকে লোভ-লালসা দ্বারা ঘিরে ফেলা হলো।
এবার জিবরীল (আঃ)-কে তিনি বললেনঃ তুমি আবার সেখানে যাও (এবং তা দেখে এসো)। তিনি সেখানে আবারো গেলেন এবং ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের কসম! আমার তো ধারণা হচ্ছে যে, কেউই এই থেকে মুক্তি পাবে না, সকলেই এতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী হা/২৫৬০, হাসান হাদীস)
নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘জান্নাত ও জাহান্নাম একদা আপোসে ঝগড়া আরম্ভ করল; জান্নাত বলল, কি ব্যাপার আমার মাঝে কেবল তারাই আসবে, যারা দুর্বল ও সমাজের নিম্নস্তরের লোক? জাহান্নাম বলল, আমার ভিতরে তো বড় বড় পরাক্রমশালী ও অহংকারী মানুষরা থাকবে।’’ আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বললেন, ‘তুমি আমার রহমত, তোমার দ্বারা আমি যাকে চাইব, রহম করব।’ আর জাহান্নামকে বললেন, ‘তুমি আমার শাস্তি, তোমার দ্বারা আমি যাকে চাইব, শাস্তি দেব।’ আল্লাহ তাআলা জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়কে পরিপূর্ণ করবেন। জান্নাতে সর্বদা তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া থাকবে। জান্নাত খালি থাকলে পরিশেষে আল্লাহ তাআলা এমন সৃষ্টি সৃজন করবেন যারা জান্নাতের অবশিষ্ট স্থানে বসবাস করবে। আর জাহান্নাম, জাহান্নামীদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও যখন আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তুমি পরিপূর্ণ হয়েছ কি?’ তখন সে ‘আরো আছে কি?’ বলে আওয়াজ দেবে। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাতে নিজ পা রেখে দেবেন, যার ফলে জাহান্নাম ‘বাস! বাস! তোমার মর্যাদার কসম!’ বলে আওয়াজ দেবে।’’ (বুখারী)
অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তবে জান্নাতে যাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কাউকে সামান্যতম যুলুমও করবেন না। আর জাহান্নামের জন্য তিনি কিছু সৃষ্টি করবেন যা দ্বারা তিনি তা পুরা করবেন। তারপরও সে বলতে থাকবেঃ আর বেশী আছে কি? তিন বার বলবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ জাহান্নামে তাঁর পবিত্র পা রাখবেন ফলে তা পূর্ণ হয়ে যাবে। তার একাংশ অপরাংশের সাথে মিলিত হয়ে যাবে। এবং বলবেঃ কাত্ব, কাত্ব, কাত্ব। (অর্থাৎ পূর্ণ হয়ে যাওয়ার শব্দ)’ বুখারীঃ হা/৭৪৪৯)।
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي صَدَقَنَا وَعْدَهُ وَأَوْرَثَنَا الْأَرْضَ نَتَبَوَّأُ مِنَ الْجَنَّةِ حَيْثُ نَشَاءُ ۖ فَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ ‘তারা (প্রবেশ করে) বলবে, প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে দেওয়া তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে এ ভূমির অধিকারী করেছেন; আমরা জান্নাতে যথা ইচ্ছা বসবাস করব। সদাচারীদের পুরস্কার কত উত্তম!’ (যুমারঃ ৭৪)।
কিন্তু ওয়ারেস মানেই মুওয়ারিস আছে। আর সেই মুওয়ারিস হল কাফেরদল। যেহেতু তারা জান্নাতের হকদার হতে পারত, কিন্তু নিজেদের দোষে সেই হক থেকে বঞ্চিত হয়ে জাহান্নামে যাবে। আর তাদের জায়গার উত্তরাধিকারী বানানো হবে মুসলিমগণকে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রত্যেক মুসলমানকে একজন ইয়াহুদী অথবা খৃষ্টানকে দিয়ে বলবেন, এই তোমার জাহান্নাম থেকে বাঁচার মুক্তিপণ।” (মুসলিম)
এ কথার অর্থ অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, প্রত্যেকের জন্য বেহেস্তে একটি নির্দিষ্ট স্থান আছে এবং দোযখেও আছে। সুতরাং মু’মিন যখন বেহেশ্তে প্রবেশ করবে, তখন দোযখে তার স্থলাভিষিক্ত হবে কাফের। (ইবনে মাজাহ)
যেহেতু সে তার কুফরীর কারণে তার উপযুক্ত। আর ‘মুক্তিপণ’ অর্থ এই যে, তুমি দোযখের সম্মুখীন ছিলে; কিন্তু এটি হল তোমার মুক্তির বিনিময়। যেহেতু মহান আল্লাহ দোযখ ভরতি করার জন্য একটি সংখ্যা নির্ধারিত রেখেছেন। সুতরাং তারা যখন তাদের কুফরী ও পাপের কারণে সেখানে প্রবেশ করবে, তখন তারা হবে মুমিনদের মুক্তিপণ। আর মুমিনরা হবে কাফেরদের ওয়ারেস।
আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। একদিন তিনি (সা.) বললেন: (কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা আদম আলায়হিস সালাম-কে লক্ষ্য করে বলবেন, হে আদম! আদম আলায়হিস সালাম উত্তরে বলবেন, হে আমার প্রভু! আমি উপস্থিত! আপনার আনুগত্যই আমার জন্য সৌভাগ্য। সমস্ত কল্যাণ আপনারই হাতে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমার আওলাদের মধ্য হতে জাহান্নামের দলকে বের কর। আদম আলায়হিস সালাম বলবেন, জাহান্নামের দলে কতজন? আল্লাহ তা’আলা বলবেন, প্রত্যেক হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় শিশু বৃদ্ধ হয়ে যাবে, প্রত্যেক সন্তানধারী মহিলার গর্ভপাত হয়ে যাবে। আর তোমরা লোকেদেরকে দেখবে নেশাগ্রস্ত, মূলত তারা নেশাগ্রস্ত নয়, বরং আল্লাহর আযাবই কঠিন। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, আমাদের মধ্য থেকে কে হবে সেই একজন? তিনি বললেন, বরং তোমরা এ সুসংবাদ জেনে রাখ যে, তোমাদের মধ্য থেকে একজন এবং ইয়াজুজ-মাজুজদের থেকে এক হাজার। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, সে মহান সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক-চতুর্থাংশ। আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেন, এ কথা শুনে আমরা সকলে ’আল্লা-হু আকবার বলে উঠলাম। অতঃপর বললেন, আমি আশা করি, তোমরা হবে জান্নাতীদের এক-তৃতীয়াংশ। তখন আমরা পুনরায় বললাম ’আল্লা-হু আকবার’। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, আমি আশা করি যে, তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবার বললাম, ’আল্লা-হু আকবার। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, মানুষের মধ্যে তোমাদের সংখ্যার তুলনা হবে যেমন একটি সাদা গরুর চামড়ার মধ্যে একটি কালো লোম অথবা একটি কালো গরুর চামড়ার মধ্যে একটি সাদা লোম ।(বুখারী হা/৪৭৪১; মিশকাত হা/৫৫৪১ ‘হাশর’অনুচ্ছেদ)।
এই ৯৯৯ জন মূলত অবিশ্বাসী ও অবাধ্য সম্প্রদায় (বিশেষ করে ইয়াজুজ ও মাজুজ) থেকে আসবে, আর জান্নাতী ১ জন হবে ঈমানদারদের মধ্য থেকে জাহান্নামীদের সংখ্যা জান্নাতীদের সংখ্যা থেকে বেশি হবে। হয়তো নৈকট্যশীল ফেরেশতা ও হুরদের থাকার মাধ্যমে জান্নাতীদের সংখ্যা বাড়বে।
ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীসের নির্দেশনা অনুসারে ইয়াজুজ-মাজুজেরা এ হুমকির মধ্যে শামিল। আর ইয়াজুজ-মাজুজ ছাড়া অন্য পূর্ববর্তী উম্মতরাও এর মধ্যে শামিল। অতএব যখন মোট জান্নাতীদের অর্ধেক পূর্ববর্তী উম্মাতের উপরে সমবেত হবে তখন তাদের এক হাজারের জন্য একজন করেই হবে। সম্ভবত এ হাদীসটির উম্মতে মুহাম্মাদীর দুই-তৃতীয়াংশ জান্নাতে যাওয়ার বর্ণিত হাদীসের পূর্বের হাদীস। কারণ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, জান্নাতীদের একশত বিশটি কাতার হবে। তন্মধ্যে আশিটি হবে উম্মতে মুহাম্মাদীর ও চল্লিশটি হবে বাকী উম্মাতের’ (সহীহ তিরমিযী হা/২৫৪৬, ইবনু মাজাহ হা/৪২৮৯)। আর এটাও হতে পারে যে, তাদের অর্ধেক প্রথমে প্রবেশ করবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
হাজারে ৯৯৯ জন জাহান্নামী, এটা মুসলিম অমুসলিম সবার মধ্য থেকে গণনা হবে। তবে তার মধ্যে উম্মাতে মুহাম্মাদীর সংখ্যা হবে মাত্র একজন। এই একজনের মধ্যে পাপী মুমিনরাও অন্তর্ভুক্ত। পাপী মুমিনরা শাস্তি ভোগ করার পর জান্নাতে যাবে। জাহান্নামীদের সংখ্যার বিষয়ে বর্ণিত মৌলিক হাদীছ দু্ইটি। এক. আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীছে প্রতি এক শত জনে ৯৯ জনকে জাহান্নাম থেকে বের করার কথা বলা হয়েছে (বুখারী হা/৬৫২৯)। যা হিসাব করলে হাজারে ৯৯০ জন দাঁড়ায়। ২. আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীছে প্রতি হাজারে ৯৯৯ জনের কথা বলা হয়েছে (বুখারী হা/৩৩৪৮)। সংখ্যার বৈপরীত্য দূরীকরণার্থে মুহাদ্দিছগণ বলেছেন, ইয়াজুজ মাজুজ ও সকল কাফের মুশরিকসহ হাজারে ৯৯৯ জন জাহান্নামী। আর ইয়াজুজ-মাজুজ ব্যতীত অন্যান্য কাফের-মুশরিকের তুলনায় হাজারে ৯৯০ জন জাহান্নামী (ফায়যুল বারী, ৫/৩৩১)।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবূল করুন, আমীন

























