ইসলাম মানুষের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। মানুষের জীবনে আল্লাহ তাআলার নিয়ামত, সুখ-সমৃদ্ধি কিংবা বিপদ-আপদ—সবই পরীক্ষা। অনেক মানুষ দুনিয়ার ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও সাফল্যকে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিদর্শন মনে করে। কিন্তু কুরআন ও হাদীস শিক্ষা দেয় যে, সব নিয়ামত আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষণ নয়। অনেক সময় অবাধ্য বান্দাকে আরও গুনাহে নিমজ্জিত করার জন্য আল্লাহ তাকে অবকাশ দেন, যা ইস্তিদরাজ নামে পরিচিত। অন্যদিকে, ঈমান ও তাকওয়ার ওপর অটল থেকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলাকে ইস্তিকামাত বলা হয়। একজন মুমিনের জীবনে ইস্তিকামাত অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইস্তিদরাজ থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য। নিচে ইস্তিদরাজ ও ইস্তেকামাতের একটি তুলনামূলক আলোচনা উপস্থাপন করা হলো-
(ক) ইস্তিদরাজ ও ইস্তিকামাত এর পরিচয় :
ইসলামী পরিভাষায় ‘ইস্তিদরাজ’ এবং ‘ইস্তেকামাত’ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারণা। বাহ্যিকভাবে উভয়টির সাথে মানুষের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বা অলৌকিক কিছু বিষয় জড়িত মনে হলেও, এদের ভেতরের উদ্দেশ্য এবং চূড়ান্ত পরিণতি আকাশ-পাতাল তফাত।
সহজ কথায়, পাপ করার পরও যদি কোনো শাস্তি না এসে উল্টো নেয়ামত বাড়তে থাকে—তবে তা ইস্তিদরাজ (আল্লাহর ঢিল)। আর শত বাধা, প্রলোভন ও কষ্টের মাঝেও যদি আল্লাহর হুকুমের ওপর টিকে থাকা যায়—তবে তা হলো ইস্তেকামাত।
(১) ইস্তিদরাজের পরিচয় :
ইস্তিদরাজ (الاستدراج) শব্দটি আরবি “দারাজা” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া। ইসলামী পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলা যখন কোনো অবাধ্য, পাপিষ্ঠ বা কাফির ব্যক্তিকে তার গুনাহ সত্ত্বেও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস, সম্পদ, ক্ষমতা ও সম্মান বৃদ্ধি করে দেন এবং সে আরও গাফিলতিতে নিমজ্জিত হয়, তখন তাকে ইস্তিদরাজ বলা হয়। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির নিদর্শন নয়; বরং ধীরে ধীরে শাস্তির দিকে অগ্রসর করার একটি পদ্ধতি। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ “যারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, আমি তাদের এমনভাবে ধীরে ধীরে পাকড়াও করব, যা তারা বুঝতেও পারবে না” (আ’রাফ : ১৮২)। তিনি আরও বলেন— فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ… “যখন তারা উপদেশ ভুলে গেল, তখন আমি তাদের জন্য সব কিছুর দরজা খুলে দিলাম। অতঃপর তারা যখন তাতে আনন্দে মেতে উঠল, তখন হঠাৎ আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম” (আনআম : ৪৪)। এসম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “যখন তুমি দেখবে যে, আল্লাহ কোনো বান্দাকে তার গুনাহের পরও দুনিয়ার প্রিয় বস্তুসমূহ দিয়ে যাচ্ছেন, তখন বুঝবে এটি ইস্তিদরাজ” (মুসনাদ আহমদ, হা/১৭৩১১)।
(২) ইস্তিদরাজের লক্ষণ :
- গুনাহ করার পরও অনুতপ্ত না হওয়া।
- নিয়ামত বৃদ্ধি পেলেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ না হওয়া।
- ইবাদতের প্রতি অনীহা।
- অহংকার ও আত্মতুষ্টি বৃদ্ধি পাওয়া।
- তওবার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তওবা না করা।
(৩) ইস্তিকামাতের পরিচয় :
ইস্তিকামাত (الاستقامة) অর্থ হলো সোজা পথে অবিচল থাকা। ইসলামী পরিভাষায়, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আল্লাহর আদেশ পালন, নিষেধ বর্জন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্বীনের ওপর দৃঢ় থাকার নাম ইস্তিকামাত। আল্লাহ তাআলা বলেন— إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا… “নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’, অতঃপর তারা অবিচল থাকে, তাদের ওপর ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয় এবং বলে—ভয় করো না, দুঃখ করো না; তোমাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে” (ফুসসিলাত : ৩০)। তিনি আরও বলেন— فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ “অতএব আপনি দৃঢ় থাকুন, যেমন আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে” (হূদ : ১১২)। এসম্পর্কে হযরত সুফিয়ান ইবন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন— আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ইসলামের এমন একটি কথা বলুন, যার পরে আর কাউকে জিজ্ঞাসা করতে না হয়।” অন্যত্র রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন— “বল, আমি আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি; তারপর এর ওপর দৃঢ় থাক” (মুসলিম হা/৩৮)।
(খ) ইস্তিদরাজ ও ইস্তিকামাতের তুলনামূলক আলোচনা :
| বিষয় | ইস্তিদরাজ | ইস্তিকামাত |
| অর্থ | ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া | সত্যের পথে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকা |
| ভিত্তি | গুনাহ ও অবাধ্যতা | ঈমান, তাকওয়া ও নেক আমল |
| আল্লাহর সন্তুষ্টি | আল্লাহর অসন্তুষ্টির লক্ষণ হতে পারে | আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম নিদর্শন |
| বাহ্যিক অবস্থা | ধন-সম্পদ ও ভোগবিলাস বৃদ্ধি পেতে পারে | সুখ-কষ্ট উভয় অবস্থায় আল্লাহর আনুগত্য |
| মানসিক অবস্থা | গাফিলতি, অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনা | বিনয়, ধৈর্য ও আল্লাহভীতি |
| পরিণতি | আকস্মিক শাস্তি ও আখিরাতের ক্ষতি | জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি |
(গ) বাস্তব জীবনে ইস্তিদরাজ ও ইস্তেকামাতের স্বরূপ :
বাস্তব জীবনে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা ও মানুষের আচরণের মাধ্যমে ইস্তিদরাজ ও ইস্তেকামাতের স্বরূপ খুব সহজেই চেনা যায়। নিচে বাস্তব জীবনের প্রেক্ষাপটে উভয় বিষয়ের কিছু স্পষ্ট উদাহরণ তুলে ধরা হলো-
১. ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে :
- ইস্তিদরাজের উদাহরণ: একজন ব্যবসায়ী ওজনে কম দেন, সুদের কারবার করেন বা পণ্যে ভেজাল মেশান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অন্যায়গুলো করার পরও তার ব্যবসায়ে দিন দিন লাভ বাড়ছে, সে একের পর এক নতুন শোরুম খুলছে এবং বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ির মালিক হচ্ছে। সে মনে করে, “আমি কত চতুর ও সফল!” আসলে এই বিপুল অবৈধ সম্পদ ও ক্রমাগত বৃদ্ধিই হলো ইস্তিদরাজ। আল্লাহ তাকে ছাড় দিচ্ছেন, যা তাকে আরও বড় ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
- ইস্তেকামাতের উদাহরণ: অপর একজন ব্যবসায়ী শত কষ্টের মাঝেও সততা ধরে রেখেছেন। বাজারে মন্দা ভাব বা লোকসান হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনো ধরনের প্রতারণা বা সুদের আশ্রয় নেন না। কম লাভে সৎভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন। পরিস্থিতির উত্থান-পতন যাই হোক না কেন, আল্লাহর হালাল-হারামের বিধানের ওপর তার এই যে দৃঢ়তা, এটাই হলো ইস্তেকামাত।
২. চাকরি ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে :
- ইস্তিদরাজের উদাহরণ: একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়মিত ঘুষ নেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করেন এবং নিজের অধিনস্তদের ওপর জুলুম করেন। কিন্তু সমাজে তার কোনো ক্ষতি হচ্ছে না, বরং সে একের পর এক প্রমোশন পাচ্ছে, ভিআইপি মর্যাদা ভোগ করছে এবং সব ধরনের আইনি ঝামেলা থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষমতা ও দাপট মূলত তার জন্য ইস্তিদরাজ।
- ইস্তেকামাতের উদাহরণ: একই অফিসের অন্য একজন কর্মকর্তা, যাকে সৎ থাকার কারণে নানা রকম চাপের মুখে পড়তে হয়, হয়তো তার প্রমোশন আটকে দেওয়া হয় বা দূরবর্তী কোনো এলাকায় বদলি করে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি কোনো দুর্নীতির কাছে মাথা নত করেন না। আল্লাহর ভয়ে নিজের দায়িত্ব সততার সাথে পালন করে যান। এই প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের নীতিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটাই ইস্তেকামাত।
৩. ইবাদত ও ধর্মীয় অনুশাসনের ক্ষেত্রে :
- ইস্তিদরাজের উদাহরণ: একজন মানুষ প্রকাশ্যে বা গোপনে নানারকম গুনাহ করে—নামাজ পড়ে না, পর্দা করে না, মানুষের গিবত করে বেড়ায়। অথচ সমাজে তার অনেক নাম-ডাক। মানুষ তাকে খুব ভালো বলে, সে সমাজে বেশ প্রভাবশালী এবং তার কোনো অসুখ-বিসুখ বা বড় বিপদ আপদও হয় না। সে ইবাদত ছাড়াই এক ধরণের কৃত্রিম মানসিক শান্তিতে ভোগে। এটি ইস্তিদরাজ, কারণ আল্লাহ তাকে তাওবা করার তাওফিক থেকে বঞ্চিত রাখছেন এবং সে বুঝতেই পারছে না সে কতটা অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে।
- ইস্তেকামাতের উদাহরণ: একজন সাধারণ মুমিন ব্যক্তি, যার জীবনে হয়তো অনেক অভাব-অনটন বা পারিবারিক সমস্যা রয়েছে। শরীর অসুস্থ থাকলেও তিনি জামাতে নামাজ ছাড়েন না। তীব্র শীতের রাতেও ফজর নামাজের জন্য বিছানা ত্যাগ করেন। যৌবনের তাড়না বা বন্ধুদের আড্ডার মাঝেও নিজেকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। জীবনের প্রতিটি মোড়ে দ্বীনের বিধানের ওপর তার এই অবিচল পথচলাই হলো ইস্তেকামাত।
৪. আধুনিক তরুণ সমাজ ও সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে :
- ইস্তিদরাজের উদাহরণ: একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার অশ্লীল, মিথ্যা বা সমাজবিধ্বংসী কনটেন্ট তৈরি করে। ইসলামের নানা বিধি-বিধান নিয়ে উপহাস করে। কিন্তু এর ফলে তার লাখ লাখ ফলোয়ার বাড়ছে, সে স্পন্সরশিপ পাচ্ছে এবং রাতারাতি তারকা বনে যাচ্ছে। এই বাহ্যিক জনপ্রিয়তা এবং অর্থ কিন্তু তার জন্য ইস্তিদরাজ বা এক ধরণের ফাঁদ।
- ইস্তেকামাতের উদাহরণ: একজন তরুণ, যার চারপাশে গুনাহের শত আয়োজন থাকা সত্ত্বেও সে নিজের চোখ ও চরিত্রকে হেফাজত করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-ভিউয়ের পেছনে না ছুটে দ্বীনি সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করে। বন্ধুরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করলেও সে তার দাড়ি, পোশাক ও শালীন আচরণ ধরে রাখে। আধুনিকতার জোয়ারে ভেসে না গিয়ে নিজের ঈমান বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াই-ই হলো ইস্তেকামাত।
সহজ কথায়, পাপ করার পরও যদি কোনো শাস্তি না এসে উল্টো নেয়ামত বাড়তে থাকে—তবে তা ইস্তিদরাজ (আল্লাহর ঢিল)। আর শত বাধা, প্রলোভন ও কষ্টের মাঝেও যদি আল্লাহর হুকুমের ওপর টিকে থাকা যায়—তবে তা ইস্তেকামাত।
(ঘ) ইস্তিদরাজ থেকে বাঁচার উপায় :
ইস্তিদরাজ এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষ গুনাহ করতে করতে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকে, কিন্তু দুনিয়ার নিয়ামত পেতে থাকায় সে মনে করে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট। বাস্তবে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি কঠিন পরীক্ষা। তাই একজন মুমিনের উচিত নিম্নোক্ত উপায়গুলো অবলম্বন করা।
১. আন্তরিক তওবা ও ইস্তিগফার করা : ইস্তিদরাজ থেকে মুক্তির প্রথম উপায় হলো আন্তরিক তওবা করা। মানুষ ভুল করবে, কিন্তু ভুলের পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকেই ফিরে আসো” (হূদ: ৩)। রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতিদিন বহুবার ইস্তিগফার করতেন, যদিও তিনি নিষ্পাপ ছিলেন। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিয়মিত “আস্তাগফিরুল্লাহ” পড়া এবং নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
২. গুনাহকে ছোট মনে না করা : অনেক মানুষ ছোট ছোট গুনাহকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু ছোট গুনাহ বারবার করতে করতে বড় গুনাহে পরিণত হয় এবং হৃদয় কঠিন হয়ে যায়। তাই সব ধরনের পাপ থেকে দূরে থাকতে হবে।
৩. নিয়ামত পেলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা : ধন-সম্পদ, স্বাস্থ্য, সম্মান বা সফলতা লাভ করলে অহংকার না করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। কৃতজ্ঞতা মানুষকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে এবং ইস্তিদরাজ থেকে রক্ষা করে।
৪. আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তোলা : প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করা উচিত। আজ আমি কী ভালো কাজ করেছি? কোনো গুনাহ করেছি কি? যদি ভুল হয়ে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে তওবা করতে হবে। ইমাম ইবনুল কাসেম (রাহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে উল্লেখ করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন: حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا، وزنوها قبل أن توزنوا، وتزينوا للعرض الأكبر” “তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই তোমরা নিজেদের হিসাব নিয়ে নাও এবং তোমাদের ওজন করার আগেই নিজেদের ওজন করে নাও। কারণ আগামীকালের হিসাবে তোমাদের জন্য সহজ হবে, যদি তোমরা আজ নিজেদের হিসাব নিয়ে নাও এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উপস্থাপনার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো, সর্বশ্রেষ্ঠ উপস্থাপনা: {সেই দিনে তোমাদেরকে পেশ করা হবে এবং তোমাদের কোনো গোপন বিষয়ই গোপন থাকবে না।} (সূত্র: মুসনাদ আল-ফারুক, পৃষ্ঠা-২/৬১৮১)।
৫. ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা : পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রমযানের সিয়াম, যাকাত ও হজ (সামর্থ্য থাকলে) যথাযথভাবে পালন করা ইস্তিদরাজ থেকে রক্ষার অন্যতম উপায়। ইবাদত মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে।
৬. কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করা : কুরআন তিলাওয়াত, অর্থ বোঝা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করলে মানুষ সঠিক পথে থাকে এবং গাফিলতি থেকে মুক্তি পায়।
৭. অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনা ত্যাগ করা : ইস্তিদরাজের বড় লক্ষণ হলো মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করে। তাই কখনোই নিজের আমলের ওপর অহংকার করা যাবে না। সর্বদা আল্লাহর রহমতের আশা এবং শাস্তির ভয় রাখতে হবে।
৮. সৎ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা : সৎ ও আল্লাহভীরু মানুষের সঙ্গে থাকলে নেক আমলের প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি হয় এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।
৯. হারাম উপার্জন থেকে বিরত থাকা : হারাম আয় মানুষের হৃদয়কে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে এবং আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে। তাই সর্বদা হালাল উপার্জনের চেষ্টা করতে হবে।
১০. আল্লাহর কাছে দোআ করা : নিয়মিত এই দোআ করা উচিত— “হে আল্লাহ! আমাকে সঠিক পথ দেখান, আপনার আনুগত্যের ওপর অটল রাখুন এবং ইস্তিদরাজ থেকে হেফাযত করুন।”
(ঙ) ইস্তিকামাত অর্জনের উপায় :
ইস্তিকামাত অর্থ হলো আল্লাহর নির্দেশিত পথে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকা। এটি অর্জন করা সহজ নয়; নিয়মিত সাধনা, আত্মসংযম ও আল্লাহর সাহায্য প্রয়োজন।
১. বিশুদ্ধ ঈমান ও আকীদা অর্জন : ইস্তিকামাতের মূল ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ ঈমান। আল্লাহ, তাঁর রাসূল ﷺ, ফেরেশতা, কিতাব, আখিরাত ও তাকদিরের ওপর সঠিক বিশ্বাস মানুষকে দৃঢ় রাখে।
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়মিত আদায় : সালাত মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। যারা সময়মতো সালাত আদায় করে, তাদের ইস্তিকামাত অর্জন সহজ হয়।
৩. কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা : প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত, অর্থ বোঝা এবং জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। কুরআন মানুষের জন্য হিদায়াতের আলো।
৪. সুন্নাহ অনুসরণ করা : রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনই একজন মুসলিমের আদর্শ। তাঁর চরিত্র, ইবাদত, লেনদেন ও আচরণ অনুসরণ করলে ইস্তিকামাত অর্জন সহজ হয়।
৫. ধৈর্য ধারন করা : সত্যের পথে চলতে গিয়ে অনেক বাধা আসে। ধৈর্য ধারণ না করলে ইস্তিকামাত বজায় রাখা কঠিন। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। বরং যা ঘটার আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটেছে এই বিশ্বাস নিয়ে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং দৃঢ় মনোবল নিয়ে কর্মের পথে এগোতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, أفضل الإيمان الصبر والسماحة ‘সর্বোত্তম ঈমান হ’ল ধৈর্য ও উদারতা’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৪৯৫; ছহীহুল জামি‘ হা/২৭৯৫)।
৬. নিয়মিত নফল ইবাদত করা : তাহাজ্জুদ, নফল সালাত, নফল সিয়াম, দান-সদকা এবং বেশি বেশি যিকির মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে এবং ঈমানকে শক্তিশালী করে।
৭. সৎ সঙ্গ গ্রহণ ও অসৎ সঙ্গ পরিহার : বন্ধু মানুষের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দ্বীনদার ও সৎ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করতে হবে।
৮. আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা : জিকির হৃদয়কে জীবন্ত রাখে। সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন দোয়া ও জিকির ইস্তিকামাত অর্জনে সহায়ক।
৯. নিয়মিত ইসলামি জ্ঞান অর্জন : কুরআন, হাদীস, ফিকহ ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অর্জন করলে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বোঝা সহজ হয় এবং ঈমান দৃঢ় হয়।
১০. আল্লাহর কাছে দৃঢ়তার জন্য দোআ করা : রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রায়ই এই দোআ করতেন— “يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ”
উচ্চারণ: ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত ক্বালবি ‘আলা দ্বীনিক।
অর্থ: “হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখুন।” (জামে তিরমিযী হা/২১৪০)
পরিশেষে, ইস্তিদরাজ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বাহ্যিক সফলতা দেখে কখনো আত্মতুষ্ট হওয়া উচিত নয়। একজন মানুষ ধনী, ক্ষমতাবান বা সম্মানিত হলেই যে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট—এমন ধারণা ভুল। অপরদিকে, ইস্তিকামাত শেখায় যে, প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর আনুগত্যে অটল থাকা। একজন মুমিন সুখে-দুঃখে, প্রাচুর্যে-অভাবেও আল্লাহর বিধান মেনে চলেন।
ইস্তিদরাজ থেকে বাঁচতে হলে গুনাহ থেকে বিরত থাকা, নিয়মিত তওবা করা, ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করা, হালাল জীবিকা অর্জন করা, আত্মসমালোচনা করা এবং কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করা অপরিহার্য। অন্যদিকে, ইস্তিকামাত অর্জনের জন্য বিশুদ্ধ ঈমান, নিয়মিত সালাত, কুরআন অধ্যয়ন, সুন্নাহ অনুসরণ, ধৈর্য, সৎ সঙ্গ, জিকির এবং আল্লাহর কাছে সর্বদা দৃঢ়তার জন্য দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রকৃত মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত দুনিয়ার বাহ্যিক সাফল্যের মোহে না পড়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইস্তিকামাতের ওপর অটল থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইস্তিকামাতের ওপর অটল রাখুন এবং ইস্তিদরাজ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

























