কিয়ামতের আলামত : সম্পদ, ব্যবসা ও ইলম বা কলমের জোর বৃদ্ধি পাওয়া

ক্বিয়ামতের আলামত সম্পর্কিত যত হাদীস রয়েছে এই হাদীস তার অন্যতম। কিয়ামতের প্রাককালে সম্পদ ব্যপকহারে বৃদ্ধিপাবে, কিন্তু বরকত থাকবে না। বরং হারামে জড়িয়ে পড়বে। কীভাবে সম্পদ আহরিত হচ্ছে এর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ থাকবে না। ব্যবসার প্রসার ঘটবে ঘরে ঘরে এমনকি নারী পুরুষ কাধে কাধ মিলিয়ে ব্যবসা করবে, কিন্তু ব্যবসায় বরকত কমে যাবে। ইলম বা কলমের জোর বৃদ্ধি পাওয়ার মাধ্যমে মানুষ অধিক হারে জ্ঞানার্জন করবে কিন্তু তা আমলে নিবে না। অনেক সময় বাহবা কিংবা রিয়া বা লৌকিকতা অথবা বাহাদুরী দেখানোর জন্য অনেকে ইলম অর্জন করবে। এছাড়াও AI তথা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসার দিনে দিনে উর্ধ্বমুখী হবে। আর একটি এলাকা জুড়ে আমানতদার পাওয়া মুশকিল হবে। অন্যহাদীস মতে, প্রকৃত ঈমানদার খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। হারামে ও অন্যয়ে জড়িত থেকে মানুষ খেয়ানতকারী ও ঈমানহীন হয়ে পড়বে। আমার মতে, সেই যুগের সূচনা হয়েছে যে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ يَفِيضَ الْمَالُ، وَتَفْشُو التِّجَارَةُ، وَيَظْهَرَ الْعِلْمُ أَوِ الْقَلَمُ قَالَ : قَالَ عَمْرٌو : فَإِنْ كَانَ الرَّجُلُ يَبِيعُ الْبَيْعَ، فَيَقُولُ : حَتَّى أَسْتَأْمِرَ تَاجِرَ بَنِي فُلانٍ، وَيَلْتَمِسُ فِي الْجَوِّ الْعَظِيمِ الْكَاتِبَ فَلاَ يُوجَدُ-

‘ক্বিয়ামতের অন্যতম আলামত হ’ল-

(ক) সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়া,

(খ) ব্যবসায়ের প্রসার হওয়া ও

(গ) ইলম বা কলমের জোর প্রকাশ পাওয়া। আমর বলেন,

(ঘ) কোন লোক যখন কোন কিছু ক্রয় করবে তখন বলবে, আমি অমুক গোত্রের ব্যবসায়ীর সাথে পরামর্শ করি। আর

(ঙ) বিরাট এলাকায় একজন লেখক খোঁজা হবে। কিন্তু পাওয়া যাবে না’। (নাসাঈ হা/৪৪৫৬; হাকেম হা/২১৪৭; সহীহাহ হা/২৭৬৭)

হাদীসের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:

এই হাদীসের প্রেক্ষাপটে আমর ইবনে তাগলিবের বরাত দিয়ে আল-তিরমিযী বর্ণনা করেছেন। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণী করা কিয়ামতের লক্ষণগুলির মধ্যে একটি। অতীত যুগে এই লক্ষণগুলির সংঘটনকে কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এটি একটি মহৎ ভবিষ্যদ্বাণীপূর্ণ হাদিস, যা কিয়ামতের ক্ষুদ্র আলামতগুলির মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত। এটি সম্পদ এবং জীবিকার প্রাচুর্যের বিস্তারকে এমন পর্যায়ে নির্দেশ করে যেখানে মুসলমানরা তাদের প্রদত্ত অর্থের পরিমাণকে সামান্য বলে মনে করবে। ব্যবসার বিস্তার এর সমৃদ্ধি নির্দেশ করে এবং জ্ঞান এবং কলমের আবির্ভাব বই এবং জ্ঞানের উপকরণের প্রাচুর্য এবং বিস্তারকে নির্দেশ করে। এই সমস্ত লক্ষণ ধারাবাহিকভাবে যুগে যুগে প্রকাশিত হয়েছে। তবে শেষ জামানাতে এর ব্যাপকতা আরো প্রকাশ পাবে।

 (ক) “সম্পদ অধিক হারে বৃদ্ধি পাবে”:

সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়া এর বিস্তার এবং প্রাচুর্যের অর্থ এতটাই যে মানুষ এতে সন্তুষ্ট হবে না, যেমন- আউফ ইবনে মালিকের হাদিসে বলা হয়েছে যে, একজন মুসলিমকে একশ দিনার দেওয়া হলে এবং অসন্তুষ্ট থাকে। কিয়ামতের লক্ষণগুলির মধ্যে”, অর্থাৎ এর লক্ষণগুলি যা এর আসন্ন আগমনকে নির্দেশ করে, “ধন-সম্পদ ছড়িয়ে পড়বে এবং বৃদ্ধি পাবে,” অর্থাৎ এটি বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষের হাতে উপস্থিত হবে, “এবং ব্যবসা ছড়িয়ে পড়বে,” অর্থাৎ ক্রয়-বিক্রয়, “এবং জ্ঞান প্রকাশিত হবে,” অর্থাৎ এটি সমৃদ্ধ হবে।

(খ) “চারিদিকে ব্যবসার প্রসার হবে”:

এর অর্থ ব্যবসার বিস্তার এবং সমৃদ্ধি, এতটাই যে ব্যবসায়ীরা আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যমের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে বিক্রয়ের বিষয়ে পরামর্শ করে। এমনকি স্বামীর ব্যবসাতে স্ত্রী সহযোগীতা করবে । এছাড়াও স্ত্রীরা সংসারের হাল ধরবে। তারা স্বামীকে তোয়াক্কা না করে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরী করবে। যা আজ দৃশ্যমান। এমনকি ঘরে ঘরে দোকান হবে।

(গ)  জ্ঞান বা কলমের জোর বৃদ্ধি পাবে”:

এটি জ্ঞানের মাধ্যমের উত্থান এবং পৃথিবী জুড়ে বইয়ের আবির্ভাব এবং বিস্তারকে বোঝায়। এটিকে জ্ঞানের বিস্তার হিসেবে বোঝা যেতে পারে, অন্যদিকে কলম হতে পারে জ্ঞানের উৎপত্তি এবং এর প্রমাণ হিসেবে এর উত্থান।

বলা হয়েছে যে এখানে জ্ঞান বলতে যা বোঝানো হয়েছে তা হল পার্থিব জ্ঞান, এবং হাদিসে “এবং জ্ঞান প্রকাশিত হবে” এর অর্থ অস্পষ্ট, বিশেষ করে যেহেতু এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে শরীয়তের অজ্ঞতা কেয়ামতের একটি লক্ষণ। বলা হয়েছিল: “এবং জ্ঞান প্রকাশিত হবে” এর অর্থ হল এটি অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং অপসারণ করা হবে, অর্থাৎ জ্ঞান পৃথিবীর মুখ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। আল-নাসাঈর কিছু সংস্করণে বলা হয়েছে: “এবং অজ্ঞতা প্রকাশ পাবে” কারণ মানুষের পার্থিব বিষয় নিয়ে ব্যস্ততা রয়েছে। আরও বলা হয়েছে: জ্ঞান বলতে যা বোঝায় তা হল পার্থিব জ্ঞান, যেমন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বলেছেন: {তারা কেবল পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিকটি জানে, কিন্তু তারা আখেরাতের ব্যাপারে গাফেল।} [আর-রুম: ৭]

জ্ঞান বলতে যা বোঝায় তা হল লেখা এবং পড়ার জ্ঞান, ইবনে আবি আসিমের আল-আহাদ ওয়া আল-মাসানিতে আমর ইবনে তাগলিব (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “কিয়ামতের লক্ষণগুলির মধ্যে একটি হল সম্পদের প্রাচুর্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়বে এবং জ্ঞান বা কলম আবির্ভূত হবে।” এটি বর্তমানে অনেক মানুষ এবং জাতির পরিস্থিতিতে স্পষ্ট; তাদের মধ্যে পার্থিব জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং আখেরাতের জ্ঞান হ্রাস পায়, অথবা তারা আল্লাহবে অবিশ্বাস করে। কর্ম ছাড়া জ্ঞান আখেরাতে অকেজো।

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) এর হাদীসে আল-বুখারী যা বলেছেন তার ভিত্তি এটি, যে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “কিয়ামতের লক্ষণগুলির মধ্যে একটি হল জ্ঞান কেড়ে নেওয়া হবে এবং অজ্ঞতা বিরাজ করবে।”

কলম বা ইলমের জোর বেড়ে যাবে’’  বর্তমানে এর ব্যাখ্যা হলো- মানুষ বেশী বেশী লেখা লেখি করবে যদিও তাদের সে বিষয়ে জ্ঞানহীনতা পরিলক্ষ্যিত হয়। এভাবে প্রকাশনার তরুন লেখক আত্মপ্রকাশ করছে যা আমার সরাসরি দেখা। আবার সম্পাদনা করছে যে কোনদিন এক লাইনও লেখেনি এটা কলমের জোর।

আর ইলমের জোর বলতে সকল প্রকার জ্ঞানকে বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআন সুন্নাহ সহ মহাকাশ বিদ্যা, যাদু বিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা তথা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা।
ক্বিয়ামতের প্রাককালে মানুষের জ্ঞানের পরিধী বেড়ে যাবে তা বৈষয়িক বিষয়ের জ্ঞান। দ্বীনের জ্ঞান থাকলেও তাদের অন্তরে বুঝের অভাব দেখা যাবে। এই জন্য রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দ্বীনের বুঝ দান করেন। দ্বীনের ইলমের চেয়ে বুঝ শ্রেয়। যার বুঝ নেই দেখতে জ্ঞানী হলেও আসলে সে মূর্খ। কারণ কিয়ামত মূর্খদের উপর অনুষ্ঠিত হবে। যেমন- শিয়ারা কুরআন পড়ে কিন্তু তা থেকে দ্বীনের সঠিক শিক্ষা গ্রহণ বা বুঝ নেয় না।  
বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির যুগে অনুধাবন করলে এটা জানা যায়, বৈষয়িক জীবনে সবচেয়ে বেশী আলোচিত বিষয় হলো- AI প্রযুক্তি। এর ফলে মানুষ যেমন দিনে দিনে নিজেদের গবেষণাধর্মী স্বকিয়তা হারাচ্ছেন, ঠিক তেমনি তথ্যনির্ভর হয়ে পড়ছেন AI প্রযুক্তির প্রতি। মানুষ চইলেও এই বেড়াজাল থেকে বের হতে পারবে না। দিনে দিনে এর প্রসারতা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাবে।  আমার ব্যক্তিগত মতামত, ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।

“একজন ব্যক্তি বিক্রি করে বলে, ‘না’, অর্থাৎ, সে বিক্রয় শেষ করবে না এবং নিশ্চিত হবে না, ‘যতক্ষণ না আমি অমুক ব্যবসায়ীর সাথে পরামর্শ করি,’ অর্থাৎ পণ্যের দাম এবং মূল্য সম্পর্কে, যা ক্রমাগত পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের এই পৃথিবীর প্রতি লোভের ইঙ্গিত দেয়।

‘লেখক খুঁজে পাওয়া যাবে না;- এর অর্থ হলো দিনে মানুষ দুনিয়াবী স্বার্থে জ্ঞানার্জনে ব্রত হলেও হাতের লেখা ভুলে যাবে। মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেখালেখি সম্পন্ন করবে। যেমন বলা যায় ভয়েজ টাইপ, স্ক্যান ডিপিইজি থেকে ডকুমেন্ট ইত্যাদি। আবার ইলমের জোর বৃদ্ধির সাথে সাথে বইয়ের ব্যবহার কমে যাবে এবং ক্লাসে প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ব্যবহার করে হাতে লেখার চর্চা বা প্রচলন ধীরে ধীরে কমে যাবে। মানুষ প্রযুক্তির সাহায্যে সকল কাজ করতে পসন্দ করবে। কেননা মানুষ দ্রুত প্রিয়।
অন্য বর্ণনা মতে, এবং একজন লেখকের খোঁজ করা হয়,’ অর্থাৎ, তাকে চাওয়া হয়, ‘মহান পাড়ায়’, যেখানে অনেক লোক থাকে, ‘একজন লেখক’, অর্থাৎ, যে মানুষের অর্থের লোভ করে না, তাই সে তাদের মধ্যে সত্যের সাথে লিখে, ‘কিন্তু তাকে পাওয়া যায় না’, অর্থাৎ, কেউ তার জন্য লিখতে পারে না, অথবা এমন কোন লেখক নেই যার ন্যায়বিচার এবং বিশ্বস্ততার গুণ রয়েছে।

এই হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অদৃশ্য সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। এই হাদিস মানুষের অর্থের লোভের বিরুদ্ধেও সতর্ক করে। এই হাদিস পার্থিব জ্ঞানের বিস্তারের দিকেও ইঙ্গিত করে, যা ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং পরকালিন জ্ঞান বা বুঝ থেকে দূরে সরে যাওয়া। পক্ষান্তরে প্রযুক্তিগত বিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া। এই হাদিস ব্যবসায়ীদের পদ্ধতি এবং কৌশলের মাধ্যমে পণ্যের উচ্চ মূল্য ছড়িয়ে দেওয়ার লোভের বিরুদ্ধেও সতর্ক করে। তারা কাজে লাগায়। এতে আরও বলা হয়েছে যে, কিয়ামত আসবে যখন এই পৃথিবী থেকে কল্যাণ কেড়ে নেওয়া হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই ধোঁকাব্যঞ্জকের যুগে সকল প্রকার পরীক্ষা, ধোঁকা থেকে হেফাযত করে পূর্ণ ঈমানের সাথে মৃত্যুদান করেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপত্তা দান করেন এই কামনা করি, আমীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loader-image

Scroll to Top