মূর্তি পূজার উৎপত্তি এবং এ বিষয়ে সর্তকতা

ভারতবর্ষের প্রাচীন ধর্মসমূহ দৃশ্যত কোন ধর্মানুষ্ঠান (অর্চনা)-এ ছবি বা মূর্তি ব্যবহার করে নি। যদিও হিন্দুধর্মের বৈদিক সাহিত্য সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদের আকারে বিস্তৃত এবং শতাব্দীর (১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) রচিত হয়েছে বলে জানা গেছে, সেখানে মন্দিরের কোন উল্লেখ নেই বা তাদের মধ্যে ধর্মানুষ্ঠান (অর্চনা)-এ ছবি বা মূর্তি পূজা নাই। পাঠ্য প্রমাণের বাইরে, প্রাচীন ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলিতে এখনও খুব প্রাচীন কোন মন্দির আবিষ্কৃত হয়নি যা সংস্কৃতির চিত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। প্রথম দিকের বৌদ্ধ ও জৈন (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০) ঐতিহ্য একইভাবে মূর্তিপূজার কোন প্রমাণ দেয় না।

বৈদিক সাহিত্যে অনেক দেব -দেবীর উল্লেখ রয়েছে, সেইসাথে হোম-এর ব্যবহার (আগুন ব্যবহার করে ভোগ দানের অনুষ্ঠান), কিন্তু এতে ছবি বা তাদের পূজার উল্লেখ নেই। প্রাচীন বৌদ্ধ, হিন্দু ও জৈন গ্রন্থে অস্তিত্বের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, ঋগ্বেদের নাসাদীয় সুক্তের মতো স্রষ্টা দেবতা আছে কি নেই, তারা ধ্যানের বর্ণনা দেয়, তারা সাধারণ সন্ন্যাসী জীবনযাপনের সুপারিশ করে এবং .স্ব-জ্ঞান, তারা ব্রহ্ম বা সুনয়তা হিসাবে পরম বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক করে, তবুও প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে ছবিগুলির ব্যবহার উল্লেখ নেই।

ভারতীয় দর্শনের অধ্যাপক জন গ্রিমসের মতে, প্রাচীন ভারতীয় চিন্তাধারা এমনকি তার প্রাচীণ ধর্মগ্রন্থগুলো গোঁড়া মূর্তিপূজাও অস্বীকার করেছিল। সবকিছুকেই চ্যালেঞ্জ, যুক্তি এবং জিজ্ঞাসার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, মধ্যযুগীয় ভারতীয় পণ্ডিত বাক্যাস্পতি মিরা বলেছিলেন যে সমস্ত ধর্মগ্রন্থই প্রামাণিক নয়, কেবল সেই ধর্মগ্রন্থ যা “ব্যক্তির আত্মা ও পরমাত্মার পরিচয় প্রকাশ করে অদ্বৈত পরম “

ম্যাক্স মুলার, জান গোন্ডা, পান্ডুরাং বমন কেন, রামচন্দ্র নারায়ণ ডান্ডেকার, হোরেস হেইম্যান উইলসন, স্টেফানি জ্যামিসন এবং অন্যান্য পণ্ডিতদের মত ইন্দোলজিস্টরা বলেন যে “প্রাচীনকালে ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্বকারী বিগ্রহ, মূর্তি বা চিত্রের কোন প্রমাণ নেই” ভারতের ধর্ম। ভারতীয় ধর্মের মধ্যে মূর্তিপূজা পরে বিকশিত হয়।

মূর্তি পূজার শুরুটা যেভাবে :

নূহ (আঃ)-এর জাতির সেই লোকেরা নিম্নোক্ত মূর্তিগুলোর ইবাদত করত। এঁরা এত প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন যে, আরবেও তাঁদের পূজা শুরু হয়েছিল। তাই وَدٌّ (অদ্দ) ‘দূমাতুল জানদল’এর কালব গোত্রের, سُوَاعٌ (সুআ) সমুদ্র উপকুলবর্তী গোত্র ‘হুযায়েল’-এর, يَغُوْثَ (য়্যাগূস) ইয়ামানের সাবার সন্নিকটে ‘জুরুফ’ নামক স্থানের ‘মুরাদ’ এবং ‘বানী গুত্বায়েফ’ গোত্রের, يَعُوْقَ (য়্যাঊক) হামদান গোত্রের এবং نَسْرٌ (নাসর) হিম্‌য়্যার জাতির ‘যুল কিলাআ’ গোত্রের উপাস্য ছিলেন। (ইবনে কাসীর, ফাতহুল ক্বাদীর)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ قَالُوۡا لَا تَذَرُنَّ اٰلِهَتَکُمۡ وَ لَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَّ لَا سُوَاعًا ۬ۙ وَّ لَا یَغُوۡثَ وَ یَعُوۡقَ وَ نَسۡرًا ‘আর তারা বলে, ‘তোমরা তোমাদের উপাস্যদের বর্জন করো না; বর্জন করো না ওয়াদ, সুওয়া‘, ইয়াগূছ, ইয়া‘ঊক ও নাসরকে’ (নূহ ৭১/২৩।

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ্ (আঃ)-এর কওমের মাঝে চালু ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ওয়াদ ’’দুমাতুল জান্দাল’’ নামক জায়গার কাল্ব গোত্রের একটি দেবমূর্তি, সূওয়া’আ, হল, হুযায়ল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ইয়াগুছ ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরবর্তীতে তা গাতীফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটবর্তী ’জাওফ’ নামক স্থান। ইয়া’উক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাসর ছিল যুলকালা’ গোত্রের হিময়ার শাখার মূর্তি। নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের কতিপয় নেক লোকের নাম নাসর ছিল। তারা মারা গেলে, শায়ত্বন তাদের কওমের লোকদের অন্তরে এ কথা ঢেলে দিল যে, তারা যেখানে বসে মাজলিস করত, সেখানে তোমরা কতিপয় মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সমস্ত পুণ্যবান লোকের নামেই এগুলোর নামকরণ কর। কাজেই তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐ সব মূর্তির পূজা করা হত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলোর ব্যাপারে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা আরম্ভ করে দেয়। [বুখারী হা/৪৯২০]

এই পাঁচটিই হল নূহ (আঃ)-এর জাতির নেক লোকদের নাম। যখন এঁরা মৃত্যুবরণ করলেন, তখন শয়তান তাঁদের ভক্তদেরকে কুমন্ত্রণা দিল যে, তোমরা এঁদের প্রতিমা বানিয়ে নিজেদের ঘরে ও দোকানে স্থাপন কর। যাতে তাঁরা তোমাদের স্মরণে সর্বদা থাকেন এবং তাঁদেরকে খেয়ালে রেখে তোমরাও তাঁদের মত নেক কাজ করতে পার। প্রতিমা বানিয়ে যারা রেখেছিল, তারা যখন মৃত্যুবরণ করল, তখন শয়তান তাদের বংশধরকে এই বলে শির্কে পতিত করল যে, ‘তোমাদের পূর্বপুরুষরা তো এদের পূজা করত, যাঁদের প্রতিমা তোমাদের বাড়িতে বাড়িতে স্থাপিত রয়েছে।’ ফলে তারা এঁদের পূজা করতে আরম্ভ করে দিল। (বুখারীঃ সূরা নূহের তাফসীর পরিচ্ছেদ)

অধিকাংশ মানুষ কিয়ামতের পূর্বে শিরকে লিপ্ত হবে:

শিরক হ’ল শরীক করা। শিরক একটি চূড়ান্ত কবীরা গুনাহ। আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করাকে শিরক বলা হয়। সেটা একক স্রষ্টার মর্যাদার সাথে হোক, তাঁর গুণাবলী ও তাঁর ইবাদত সমূহের সাথে হোক। সমাজে বহু শিরকী কাজ চালু রয়েছে। যেমন মূর্তিপূজা, পীরপূজা, মাযার ও কবরপূজা, মাযারে শিরনী দেয়া, কবরবাসীর কাছে কিছু চাওয়া, কবরে চাদর চড়ানো, ফুল দেয়া, মানত করা, তাবীয লটকানো, গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা ও কসম করা ইত্যাদি শিরকী কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আর এসব পূজা-অর্চনাকে শিরকে আকবার বলে, যা শয়তানী কাজ এবং কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوْهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ ‘হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, পূজার বেদী, শুভাশুভ নির্ণয়ের তীর, এসবই গর্হিত বিষয় ও শয়তানী কাজ। অতএব তোমরা এসব থেকে দূরে থাক। যাতে তোমরা সফলকাম হ’তে পারো’ (মায়েদাহ ৫/৯০)।

কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মুশরিক হয়ে যাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«وَلاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِى بِالْمُشْرِكِينَ وَحَتَّى تَعْبُدَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِى الأَوْثَانَ» “ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতদিন আমার উম্মতের কিছু লোক মুশরিকদের সাথে যোগ না দিবে এবং যতদিন আমার উম্মতের কিছু লোক মূর্তি পূজা না করবে” (মিশকাত হা/৫৪০৬)।

(অন্ধভাবে) আলেম, বজুর্গ ও নেতাদের আনুগত্য করলো, সে মূলত তাদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করে বা মান্য করে থাকে। আল্লাহ তা’আলা বলেন : اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَهُمۡ وَ رُهۡبَانَهُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ وَ الۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَ مَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـهًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ؕ سُبۡحٰنَهٗ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ  তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের* রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।রা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের ধর্মীয় নেতা ও পুরোহিতদেরকে রব হিসেবে বরণ করে নিয়েছে।’’ (তাওবা ৯/৩১)

এ আয়াতের তাফসীর; আদী বিন হাতিম(রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায়। আদী ইবনু হাতিম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গলায় স্বর্ণের ক্রুশ পরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এলাম। তিনি বললেনঃ হে ‘আদী! তোমার গলা হতে এই প্রতিমা সরিয়ে ফেল।

আদী ইবনু হাতিম (রাযিঃ)বলেন তখন নাবী (সাঃ)-এর মুখে এ আয়াত তেলাওয়াত করতে শুনতে পাই। তখন আমি বললাম, আমরা তো তাদের ইবাদত করিনা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: আল্লাহ তা‘আলা যা হালাল করেছেন সেটা কি তারা হারাম করে দেয়না? অতঃপর তোমরাও তা হারাম হিসেবে গ্রহণ করে নাও। আল্লাহ তা‘আলা যা হারাম করে দিয়েছেন- তারা কি সেটা হালাল করে দেয়না? অতঃপর তোমরা তা হালাল হিসেবে গ্রহণ করে নাও। আমি বললাম: হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: এটাই তাদের ইবাদত করা। (তিরমিজী হা/৩০৯৫)

তাদেরকে তো শুধু এ নির্দেশই দেয়া হচ্ছিল যে, তারা এক ইলাহেরই ইবাদত করবে, যিনি কোন কিছু হারাম করলেই কেবল তা হারাম হবে, আর যিনি হালাল করলেই তা হালাল হবে। অনুরূপভাবে যিনি শরীআত প্রবর্তন করলে সেটাই মানা হবে, তিনি হুকুম দিলে সেটা বাস্তবায়িত হবে। তিনি ব্যতীত আর কোন সত্য ইলাহ নেই। তারা যা তাঁর সাথে শরীক করছে তা থেকে তিনি কতই না পবিত্র। তাঁর সন্ততি নেই, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি ছাড়া কোন রব নেই। [ইবন কাসীর] কিন্তু তারা সে নির্দেশের বিপরীত কাজ করেছে। তার সাথে শরীক করেছে। মহান আল্লাহ তাদের সে সমস্ত অপবাদ ও শরীক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তার পূর্ণতার বিপরীত তার জন্য যে সমস্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ গুণ সাব্যস্ত করে তা গ্রহণযোগ্য নয়। [সা’দী]

মুসলমান এমন জাতি যারা পূজা পার্বন থেকে দূরে সরে থাকে। এদের দ্বারা কোন মানুষ যেমন কষ্ট পায় না, তেমনি এরা অন্যের অনিষ্টতা করাকে ঘৃণা করে। এরা প্রতিবেশীর হক্ব নষ্ট করে না, বরং রক্ষা করে। এরা যুলুম করে না আল্লাহর প্রতি ও নিজের প্রতি এবং অন্য সম্প্রদায়ের প্রতিও। ন্যায় ও ইনসাফের মানদণ্ড হলো একমাত্র প্রকৃত মুসলমান জাতি। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ ও হেদায়েত দান করুন, আমীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loader-image

Scroll to Top