উত্তম দানের উত্তম প্রতিদান

বান্দার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সকল রহমত ও কল্যাণ নাযিল হয়, আর তা হলো- বারাকাহ। বারাকাহর ব্যাপক অর্থ হলেও সৎ আমল করার জন্য যোগ্যতা সমচেয়ে উত্তর বারাকাহ। সৎ আমল করার পূর্বে যা অর্জন করতে হয় তা হলো- ঈমান, ইলম ও দ্বীনের সঠিক বুঝ, হেদায়াত, সুস্থ্যতা, পবিত্র সম্পদ ইত্যাদি। তবে মনে রাখবেন, ঈমান, ইলমের সঠিক বুঝ, হেদায়াত, সম্পদ, হায়াত প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপযুক্ততা বা ধারন ক্ষমতানুসারে রূহ জগতে বণ্টন করে দিয়েছেন। আর এগুলো প্রাপ্তি রিযিক এবং বৃদ্ধি হওয়াকে বারাকাহ বলে।  আল্লাহ তাআলা বলেন, مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً وَاللهُ يَقْبِضُ وَيَبْسُطُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ‘কোন সে ব্যক্তি যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিবে, অতঃপর তিনি তার বিনিময়ে তাকে বহুগুণ বেশী প্রদান করবেন? বস্ত্ততঃ আল্লাহ্ই রূযী সংকুচিত করেন ও প্রশস্ত করেন। আর তাঁরই দিকে তোমরা ফিরে যাবে’ (বাক্বারাহ ২/২৪৫)। অন্যত্র তিনি বলেন,وَأَقْرَضُوا اللهَ قَرْضًا حَسَنًا يُضَاعَفُ لَهُمْ وَلَهُمْ أَجْرٌ كَرِيْمٌ ‘নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেয়, তাদেরকে দেওয়া হবে বহুগুণ বেশী। আর তাদের জন্যে রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার’ (হাদীদ ৫৭/১৮)

দান-ছাদাক্বার মাধ্যমে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে  উপকৃত হয়ে থাকেন। যদিও তা যৎসামান্য হয়। এমনকি তা উত্তম ও শান্তনাদায়ক কথাও হয়। তবে শর্ত প্রযোজ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,الَّذِيْنَ يُنْفِقُوْنَ أَمْوَالَهُمْ فِيْ سَبِيلِ اللهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُوْنَ مَا أَنْفَقُوْا مَنًّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ، ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, অতঃপর যা ব্যয় করেছে, তার পিছনে খোঁটা দেয় না এবং কোন কষ্টও দেয় না, তাদের জন্য তাদের রবের নিকটে প্রতিদান রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না’ (বাক্বারাহ ২/২৬২)

দ্বীনি ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলা ও সাক্ষাত করাও উত্তম ছাদাক্বাহ। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طَلْقٍ. ‘কল্যাণমূলক কোন কর্মকেই অবজ্ঞা করো না, যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করেও হয়’ (মুসলিম হা/২৬২৬; মিশকাত হা/১৯১০)। তিনি আরো বলেন,إِنَّ تَبَسَّمَكَ فِيْ وَجْهِ أَخِيْكَ يُكْتَبُ لَكَ بِهِ صَدَقَةٌ ‘নিশ্চয়ই তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করায় তোমার জন্য ছাদাক্বার ছওয়াব লেখা হয়’ (ছহীহ আত-তারগীব হা/২৬৮৬)।

দান-ছাদাক্বার মাধ্যমে মানুষ কঠিন ও জটিল রোগ থেকে অব্যাহতি পায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)বলেছেন, دَاوُوْا مَرْضَاكُمْ بِالصَّدَقَةِ ‘তোমরা ছাদাক্বার মাধ্যমে তোমাদের রোগীদের প্রতিষেধকের ব্যবস্থা কর’ (ছহীহুল জামে‘ হা/৩৩৫৮; সনদ হাসান)। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,تَصَدَّقُوا وَلَوْ بِتَمْرَةٍ، فَإِنَّهَا ‌تَسُدُّ ‌مِنَ ‌الْجَائِعِ، وَتُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ، كَمَا يُطْفِئُ الْمَاءُ النَّارَ، ‘তোমরা একটি খেজুর হ’লেও ছাদাক্বা কর। কেননা ছাদাক্বা অনাহারীর ক্ষুধা নিবারণ করে এবং পাপকে মিটিয়ে দেয়, যেমনভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়’ (ছহীহুল জামে‘ হা/২৯৫১; ছহীহাহুত তারগীব হা/৮৬৫, সনদ ছহীহ)।

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (১১৮-১৮১ হি.)-এর নিকটে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন যে, গত ৭ বছর যাবৎ আমার হাঁটুতে একটি ফোঁড়া উঠে খুব কষ্ট দিচ্ছে। এ পর্যন্ত অনেক ডাক্তারের নিকটে বিভিন্ন চিকিৎসা গ্রহণ করেছি। কিন্তু কোন উপকার পাইনি। এখন আমি কি করতে পারি? আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) বললেন, তুমি অমুক স্থানে একটা কুপ খনন কর। পানির জন্য সেখানকার মানুষ খুব কষ্ট পাচ্ছে। আশা করি ফোঁড়াটির মূল অংশ বের হয়ে যাবে এবং রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে। অতঃপর লোকটি তাই করল এবং আল্লাহর রহমতে সে আরোগ্য লাভ করল (বায়হাক্বীশু‘আবুল ঈমান ৫/৬৯; যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৭/৩৮৩)

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা,

(১) গত বছর ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে আমি অধিক বিচলিত হই এবং বিপজ্জনকভাবে টেনশন করতে থাকি। এসময় আমি আমার ভালো বন্ধুদের পরামর্শ ও সহযোগীতা কামনা করি। আলহামদুলিল্লাহ, সবায় আমাকে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে আমর একজন বন্ধু আমার কাছে আসেন। আর সে বিস্তারিত শুনে বিচক্ষণতার সাথে তা সমাধানের পথ বের করেন এবং সফল হোন। তার কৌশলগত সমাধান আমাকে কল্যাণের পথে এগিয়ে দেয় এবং সম্মানিত করে।

মূলকথা হলো- আমরা দুজনে লিখিতভাবে সমাধান করে আমার দোকানে এসে বসে থেকে বিভিন্নভাবে সমস্যার পর্যালোচনা করছিলাম ঠিক এমন সময় তার নিকটে একটি ফোন আসে কথা শেষ করে বলে দোস্ত আমি একটি সমস্যায় ছিলাম এবং সমাধানের জন্য ছয় মাসেরও বেশী সময় পার করেছি। কিন্তু আজকে বিনা ঝামেলায় তার সমাধান হলো। সমস্যার সমাধান পেয়ে আমার বন্ধুর চেহারা হাস্যোজ্জল ও প্রফুল্ল দেখাচ্ছিল।

আমি আমার বন্ধুকে থামিয়ে দিয়ে বললাম- দোস্ত তুমি ভালো কাজের বিনিময় পেয়েছ। তুমি যেমন আমার বিপদে এগিয়ে এসে সমাধান করে দুশ্চিন্তমুক্ত করেছ, আমাদের প্রতিপালক ঠিক সেভাবেই তোমাকে প্রতিদান স্বরূপ এই ফায়সালা দিয়েছেন। আমাদের শুকরিয়াকারী বান্দা হওয়া উচিৎ। আর চক্ষুষ্মান ব্যক্তি ব্যতীত এ সকল বিষয় উপলব্ধি করে না।

(২) গত বছর ২০২৫ সালে একজন রোগীর অভিভাবক ও পজেটিভ রক্ত নেয়ার জন্য আমাকে কল করে এবং আমি সেখানে গিয়ে রক্ত দান করি। রোগীর খোজ নিতে গিয়ে জানতে পারলাম সে বর্তমানে মিসকিন এই চিকিৎসা খরচ বহন করতে গিয়ে। এরপরেও উদারতা দেখিয়ে আমাতে ২০০ টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ভাই আপনি একটা ডাব কিনে খাবেন। আমি জবাবে বলি, এই টাকা আমার চেয় আপনার প্রয়োজন বেশী, রেখে দেন। সে আমার সামনে পথ আটকিয়ে টাকা দেয়ার জন্য জোরাজরি করলে আমি পাশ কাটিয়ে চলে আসি। কিন্তু আমার আল্লাহ সব দেখেছেন, তিনি সেদিন ঐ টাকার বিনিময়ে আমাকে কয়েক গুণ টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার কর্মের মাধ্যমে। বলাবাহুল্য, ছাদাক্বাহ বর্ধিত করে সম্পদ।

দান ছাদাকাহ দয়ার স্তর। জমিনবাসীর প্রতি দয়া করা। আর এর ফলে আল্লাহর রহমত ও নেয়ামত প্রাপ্ত হওয়া। হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, خير الناس أنفعهم للناس ‘সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী’ (ছহীহুল জামি‘ হা/৩২৮৯)।

জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে লোক মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়ালু হোন না’ (মিশকাত হা/৪৯৪৭)। অন্যত্র বলেন, ‘আল্লাহর রহমত তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দান করেন। আর আল্লাহ তাঁর দয়াশীল বান্দাদের দয়া করে থাকেন’(বুখারী হা/৫৬৫৫)।

অল্প হলেও প্রতিদিন দান-ছাদাক্বাহ করায় অভ্যস্ত থাকুন। কেননা, দাতা বরকত প্রাপ্ত হয় এবং কৃপণ ধ্বংস হয়। দান-ছাদাক্বাহ থেকে বিরত হবেন না। যদিও তা ভালো কথা বা পরামর্শ হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তিনি পবিত্র দান গ্রহণ করেন। মনে রাখবেন, হারাম উপার্জিত সম্পদে দান ছাদাক্বাতে গরীব মানুষ উপকার পেলেও তা হারামী ব্যক্তির কোন উপকারে আসে না। সুতরাং যৎসামান্য দান হলেও তা পবিত্র উপজার্ন থেকে দান করুন। দান ছাদাক্বাহ হালাল বৈ হারাম আল্লাহ তা‘আলা গ্রহণ করেন না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ جَمَعَ مَالًا حَرَامًا ثُمَّ تَصَدَّقَ بِهِ لَمْ يَكُنْ لَهُ فِيهِ أَجْرٌ، وَكَانَ إِصْرُهُ عَلَيْهِ ‘যে ব্যক্তি হারাম সম্পদ উপার্জন করল এবং তা দ্বারা ছাদাক্বাহ করল। তার জন্য কোন নেকী নেই। বরং এর গোনাহ তার উপরেই বর্তাবে’ (ছহীহ ইবনে হিববান হা/৩৩৫৬, ছহীহুত তারগীব হা/৮৮০)। কারণ আল্লাহ বলেন, ‘একের পাপের বোঝা অন্যে বইবে না’ (আন‘আম ৬/১৬৪)।

 আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা আমাদেরকে উত্তম দান করার তাওফীক্ব দান করুন, আমীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

loader-image

Scroll to Top