আল্লাহ তা‘আলা যখন বিচারের মাঠে বান্দার আমলের বিচার করবেন, তখন তিনি এই নিয়াতের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিচার কার্য পরিচালনা করবেন। কেননা ইহা এমন একটি অদৃশ্য বিষয় যা কেবল কোন ব্যক্তির ক্বলব বা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে। মানুষ যেমন ইচ্ছা করবে তার প্রতিদানও অনুরূপ হবে। আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে কতিপয় সাহাবী তাঁকে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামত দিবসে আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ। তিনি আরো বললেনঃ দুপূরে মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য অবলোকন করতে কি তোমাদের ধাক্কাধাক্কির সৃষ্টি হয়? সকলে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! না, তা হয় না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ঠিক তদ্রুপ কিয়ামত দিবসে তোমাদের প্রতিপালককে অবলোকন করতে কোনই বাধার সৃষ্টি হবে না। সেদিন এক ঘোষনাকারী ঘোষণা দিবে, “যে যার উপাসনা করতে, সে আজ তার অনুসরণ করুক”।
তখন আল্লাহ ব্যতীত যারা অন্য দেব-দেবী ও বেদীর উপাসনা করত, তাদের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না ; সকলেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। সৎ হোক বা অসৎ যারা আল্লাহর ইবাদত করত, তারাই কেবল অবশিষ্ট থাকবে এবং কিতাবীদের যারা দেব-দেবী ও বেদীর উপাসক ছিল না তারাও বাকি থাকবে। এরপর ইহুদীদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে! তোমরা কার ইবাদত করতে? তারা বলবে, আল্লাহর পূত্র উযায়েরের। তাদেরকে বলা হবে মিথ্যা বলছ। আল্লাহ কোন পত্নী বা সন্তান গ্রহণ করেননি। তোমরা কি চাও? তারা বলবে, হে আল্লাহ! আমাদের খুবই পিপাসা পেয়েছে। আমাদের পিপাসা নিবারণ রুকন। প্রার্থনা শুনে তাদেরকে ইঙ্গিত করে মরীচিকাময় জাহান্নামের দিকে জমায়েত করা হবে। এর একাংশ আরেক অংশকে গ্রাস করতে থাকবে। তারা এতে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
এরপর খৃষ্টানদেরকে ডাকা হবে, বলা হবে, তোমরা কার ইবাদত করতে? তারা বলবে, আল্লাহর পুত্র মসীহের উপাসনা করতাম। বলা হবে, মিথ্যা বলছ। আল্লাহ কোন পত্নী বা সন্তান গ্রহণ করেননি। জিজ্ঞেস করা হরে, এখন কি চাও? তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের দারুন তৃষ্ণা পেয়েছে, আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করুন। তখন তাদেরকেও (পানির ঘাটে যাবার) ইঙ্গিত করে জাহান্নামের দিকে জমায়েত করা হবে। একে মরীচিকার মত মনে হবে। এর এক অংশ অপর অংশকে গ্রাস করে নিবে। তারা তখন জাহান্নামে ঝাপিয়ে পড়তে থাকবে। শেষে মুমিন হউক বা গুনাহগার, এক আল্লাহর উপাসক ব্যতীত আর কেউ (ময়দানে) অবশিষ্ট থাকবে না।
তখন আল্লাহ জন্য তাদের কাছে আসবেন। বলবেন, সবই তাদের স্ব স্ব উপাস্যের অনুসরণ করে চলে গেছে, আর তোমরা কার অপেক্ষা করছ? তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু! যেখানে আমরা বেশি মুখাপেক্ষী ছিলাম, সেই দুনিয়াতে আমরা অপরাপর মানুষ থেকে পৃথক থেকেছি এবং তাদের সঙ্গী হইনি। তখন আল্লাহ বলবেন, আমিই তো তোমাদের প্রভূ। মুমিনরা বলবে, “আমরা তোমার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি- আল্লাহর সঙ্গে আমরা কিছুই শরীক করি না। এই কথা তারা দুই বা তিনবার বলবে। এমন কি কেউ কেউ অবাধ্যতা প্রদর্শনেও অবতীর্ণ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলবেন, আচ্ছা, তোমাদের কাছে এমন কোন নিদর্শন আছে যদ্দ্বারা তাকে তোমরা চিনতে পার? তারা বলবে, অবশ্যই আছে। এরপর “সাক” উন্মোচিত হবে, তখন পৃথিবীতে যারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আল্লাহর উদ্দেশে সিজদা করত, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা সিজদা করার অনুমতি দিবেন। আর যারা লোক দেখানো বা লোকভয়ে আল্লাহকে সিজদা করত, সে মুহূর্তে তাদের মেরুদন্ড শক্ত ও অনমনীয় করে দেয়া হবে। যখনই তারা সিজদা করতে ইচ্ছা করবে তখনই তারা চিত হয়ে পড়ে যাবে। তারপর তারা মাথা তুলবে।
ইত্যবসরে তারা আল্লাহকে প্রথমে যে আকৃতিতে দেখেছিল তা পরিবর্তিত হয়ে যাবে এবং তিনি তার আসল রুপে আবির্তূত হবেন। অনন্তর বলবেন, আমি তোমাদের রব, তারা বলবে হ্যাঁ, আপনি আমাদের প্রতিপালক। তারপর জাহান্নামের উপর জিস্র (পূল) স্থাপন করা হবে। শাফায়াতেরও অমুমতি দেয়া হবে। মানুষ বলতে থাকবে, হে আল্লাহ! আমাদের নিরাপত্তা দিন, আমাদের নিরাপত্তা দিন। জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসুল জিসর কি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এটি এমন স্থান, যেখানে পা পিছলে যায়। সেখানে আছে নানা প্রকারের লৌহ শলাকা ও কাঁটা, দেখতে নজদের নাদান বৃক্ষের কাঁটার মত।
মুমিনগণের কেউ এ পথ পলকের গতিতে, কেউ বিদ্যুতের গতিতে, কেউ বায়ুর গতিতে, কেউ অশ্বগতিতে, কেউ উষ্ট্রের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ অক্ষত অবস্থায় নাজাত পাবে আর কেউ হবে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় নাজাতপ্রাপ্ত। আর কতককে কাঁটাবিদ্ধ অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অবশেষে মুমিনগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ করবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সে সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, ঐ দিন মুমিনগণ তাঁদের ঐসব ভাইয়ের স্বার্থে আল্লাহর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবে, যারা জাহান্নামে রয়ে গেছে। তোমরা পার্থিব অধিকারের ক্ষেত্রেও এমন বিতর্কে লিপ্ত হও না।
তারা বলবে, হে রব! এরা তো আমাদের সাথেই সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করত, রোযা পালন করত, হাজ্জ (হজ্জ) করত। তখন আল্লাহ তাদেরকে নির্দেশ দিবেনঃ যাও তোমাদের পরিচিতদের উদ্ধার করে আন। উল্লেখ্য, এরা জাহান্নামে পতিত হলেও মুখমন্ডল আযাব থেকে রক্ষিত থাকবে। (তাই তাদেরকে চিনতে কোন অসুবিধা হবে না।) মুমিনগণ জাহান্নাম থেকে এক বিরাট দলকে উদ্ধার করে আনবে। এদের অবস্থা এমন হবে যে, কারোর পায়ের অর্ধ গোড়ালি পর্যন্ত, আবার কারো হাঁটু পর্যন্ত দেহ অগ্নি ভস্ম করে দিয়েছে। উদ্ধার শেষ করে মুমিনগণ বলবে, হে রব! যাদের সম্পর্কে আপনি নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, তাদের মাঝে আর কেউ অবশিষ্ট নেই।
আল্লাহ বলবেন, পূনরায় যাও, যার অন্তরে এক দ্বীনার পরিমাণও ঈমান অবশিষ্ট পাবে তাকেও উদ্ধার করে আন। তখন তারা আরও একদলকে উদ্ধার করে এনে বলবে, হে রব! অনুমতি প্রাপ্তদের কাউকেও রেখে আসিনি। আল্লাহ বলবেন, আবার যাও, যার অন্তরে অর্ধ দ্বীনার পরিমাণও ঈমান অবশিষ্ট পাবে তাকেও বের করে আন। তখন আবার এক বিরাট দলকে উদ্ধার করে এনে তারা বলবে হে রব! যাদের আপনি উদ্ধার করতে বলেছিলেন, তাদের কাউকে ছেড়ে আসিনি। আল্লাহ বলবেনঃ আবার যাও, যার অন্তরে অণূ পরিমাণও ঈমান বিদ্যমান, তাকেও উদ্ধার করে আন। তখন আবারও এক বিরাট দলকে উদ্ধার করে এনে তারা বলবে, হে রব! যাদের কথা বলেছিলেন, তাদের কাউকেই রেখে আসিনি।
সাহাবী আবূ সাঈদ আল খূদরী (রাঃ) বলেন, তোমরা যদি এ হাদীসের ব্যাপারে আমাকে সত্যবাদী মনে না কর তবে এর সমর্থনে নিম্নোক্ত আয়াতটিও তিলাওয়াত করতে পারঃ (অর্থৎ আল্লাহ অণূ পরিমাণও জুলুম করেন না এবং অণূ পরিমাণ নেক কাজ হলেও আল্লাহ তা দ্বিগুন করে করে দেন এবং তাঁর কাছ থেকে মহা-পুরস্কার প্রদান করেন।” (৪ঃ ৪০) এরপর আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করবেনঃ “ فَيَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ شَفَعَتِ الْمَلاَئِكَةُ وَشَفَعَ النَّبِيُّونَ وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُونَ وَلَمْ يَبْقَ إِلاَّ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنَ النَّارِ فَيُخْرِجُ مِنْهَا قَوْمًا لَمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا قَطُّ قَدْ عَادُوا حُمَمًا فَيُلْقِيهِمْ فِي نَهْرٍ فِي أَفْوَاهِ الْجَنَّةِ ফেরেশতারা সুপারিশ করলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গণও সুপারিশ করলেন এবং মুমিনরাও সুপারিশ করেছে, কেবল আরহামূর রাহিমীন-পরম দয়াময়ই রয়ে গেছেন। এরপর তিনি (আল্লাহ) জাহান্নাম থেকে একু মুঠো তুলে আনবেন, ফলে এমন একদল লোক মুক্তি পাবে, যারা কখনো কোন সৎকর্ম করেনি, এবং আগুনে জ্বলে অঙ্গার হয়ে গেছে। পরে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ মুখের ’নাহরুল হায়াতে’ ফেলে দেয়া হবে। তারা এতে এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে, যেমন শস্য অংকুর স্রোতবাহিত পানিতে সতেজ হয়ে ওঠে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি কোন বৃক্ষ কিংবা পাথরের আড়ালে কোন শস্য দানা অংকুরিত হতে দেখনি? যেগুলো সূর্য কিরণের মাঝে থাকে সেগুলো হলদে ও সবুজ রুপ ধারণ করে আর যেগুলো ছায়ামুক্ত স্থানে থাকে, সেগুলো সাদা হয়ে যায়। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! মনে হয় আপনি যেন গ্রামাঞ্চলে পশু চরিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এরপর তারা নহর থেকে মূক্তার মত ঝকঝকে অবস্থায় উঠে আসবে এবং তাদের গ্রীবাদেশে মোহরাঙ্কিত থাকবে, যা দেখে জান্নাতিগণ তাদের চিনতে পারবেন। এরা হলো ’উতাকাউল্লাহ’ আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত। ”আল্লাহ তায়ালা সৎ আমল ব্যতীতই তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন।
এরপর আল্লাহ তাদেরকে লক্ষ করে বলবেনঃ যাও, জান্নাতে প্রবেশ কর। আর যা কিছু দেখছ সবকিছু তোমাদেরই। তারা বলবে, হে রব! আপনি আমাদেরকে এতই দিয়েছেন যা সৃষ্ট-জগতের কাউকে দেননি। আল্লাহ বলবেনঃ তোমাদের জন্য আমার কাছে এর চেয়েও উত্তম বস্তু আছে। তারা বলবে, কি সে উত্তম বস্তু? আল্লাহ বলবেনঃ সে হল আমার সন্তুষ্টি। এরপর আর কখনো তোমাদের উপর অন্তুষ্ট হবো না। (বুখারী হা/৮০৬, মুসলিম হা/২৯৯, আবূদাউদ হা/৭৭০৩, মিশকাত হা/৫৫৭৯)
ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেনঃ শাফা’আত সম্পর্কীয় এ হাদীসটি আমি ঈসা ইবনু হাম্মাদ যুগবা আল মিসরী-এর কাছে পাঠ করে বললাম, আপনি লায়স ইবনু সা’দ থেকে নিজে এ হাদীসটি শুনেছেন? আমি কি আপনার পক্ষ থেকে এ হাদীসটি এরুপ বর্ণনা করতে পারি? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। এরপর আমি ঈসা ইবনু হাম্মাদকে হাদীসটি এ সুত্রে শুনিয়েছি যে, ঈসা ইবনু হাম্মাদ (রহঃ) আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) সুত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি আমাদের প্রভুকে দেখতে পাব? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর করলেনঃ মেঘমূক্ত আকাশে সূর্য দর্শনে ভিড়ের কারণে তোমাদের কি কোন অসুবিধা হয়? আমরা বললাম, না…। (বুখারী হা/১৮৩)।
অপর হাদীছে এসেছে, আবূ উমামাহ্ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, «وَعَدَنِي رَبِّي أَنْ يُدْخِلَ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِي سَبْعِينَ أَلْفًا لَا حِسَابَ عَلَيْهِمْ وَلَا عَذَابَ مَعَ كُلِّ أَلْفٍ سَبْعُونَ أَلْفًا وَثَلَاثُ حَثَيَاتٍ مِنْ حَثَيَاتِ رَبِّي» ‘আমার প্রভু আমার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্য থেকে সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তাদের ওপর ’আযাবও হবে না। আবার উক্ত প্রত্যেক হাজারের সাথে সত্তর হাজার এবং আমার প্রভুর তিন অঞ্জলি ভর্তি লোকও জান্নাতে প্রবেশ করাবেন’। (আহমাদ হা/২২৩৫৭, তিরমিযী হা/২৪৬৭, ছহীহুল জামি‘ হা/৭০৬২, মিশকাত হা/৫৫৫৬)।
আল্লাহ তা‘আলা এ উম্মতের তিন অঞ্জলি ভর্তি লোক জান্নাতে দিয়ে রাসূল (ছা.)-কে সন্তুষ্ট করে দিবেন । আমরা এ নবী (ছা.)-এর উম্মাত হতে পেরে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি আলহামদুলিল্লাহ।
কাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (خير) (খায়র) শব্দের অর্থ ইয়াকীন। সহীহ হলো নিরেট ঈমানের পর অতিরিক্ত কোন নেক কর্ম। এবারও তারা গিয়ে বহু মানুষকে বের করে আনবেন। আল্লাহ তা’আলা মু’মিনদের আবার বলবেন, যাদের অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণ খায়র রয়েছে তাদের বের কর, অতঃপর তাদের বের করা হবে। এদের সংখ্যাও হবে অনেক। আবার বলা হবে, ফিরে যাও যার অন্তরে এক যাররা পরিমাণ খায়র পাও তাকেও বের কর। এবারও অনেক মানুষকে বের করা হবে। তারা বলবেন, হে আল্লাহ! আমরা খায়র থাকা কোন ব্যক্তিকে রেখে আসিনি। আল্লাহ তা’আলা মুষ্ঠিভরে এমন একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করবেন যারা কখনও কোন خير (খায়র) নেক আমল করেনি। শুধু ঈমানের বিশ্বাসটুকুই তাদের ছিল, নেক ‘আমল বলতে কিছুই ছিল না। তাদের আদৌ কোন নেক আমল না থাকা এবং ঈমান অতীব সূক্ষ্ম এবং হালকা থাকায় নবী-রাসূল এবং মু’মিনগণের দৃষ্টিতে তা আসেনি, ফলে তারা তাদের জন্য শাফা’আত করতে পারেননি। অবশেষে আহকামুল হাকিমীন তাদের মধ্যে ঐ লুক্কায়িত ঈমান দেখে জাহান্নাম থেকে বের করবেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, হা. ২৯৯)।
ব্যাখ্যা : কিয়ামতের দিন এমন ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে যে মানুষের দিক-বিদিক জ্ঞান থাকবে না। মানুষ দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে থাকবে, অতঃপর কিছু মানুষ পরামর্শ করে আদি পিতা আদম এর কাছে আসবে এবং বলবে, আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে একটু শাফা’আত বা সুপারিশ করুন, তিনি যেন দ্রুত হিসাবের নির্দেশ করেন যাতে আমরা একটু শান্তি পাই অথবা আমাদের প্রতিফল যাই হোক এটা পেয়ে যাই এবং হাশরের ময়দানের এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি পাই। আদম ‘আলায়হিস সালাম বলবেন, আমি এ কাজের উপযুক্ত নই বরং তোমরা ইবরাহীম-এর কাছে যাও তিনি আল্লাহর খলীল। লোকেরা ইবরাহীম-এর কাছে যাবে তিনিও একই কথা বলবেন। এভাবে বিভিন্ন নবীদের কাছে মানুষ যাবে কিন্তু কেউ শাফাআতের সাহস করবেন না। সকল নবী নিজ নিজ ভুলের কথা স্মরণ করে ভীত এবং লজ্জিত হয়ে আল্লাহর সামনে যেতে সাহস করবেন না।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তারা সবাই বলবেন, আল্লাহ তা’আলা আজ এত রাগান্বিত হয়েছেন যা ইতোপূর্বে আর কখনো হননি এবং হবেন না। অতএব তার সামনে যেতে পারব না। অবশেষে লোকেরা যখন নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর কাছে আসবে তিনি বলবেন, হ্যাঁ, আমিই এ কাজের জন্য উপযুক্ত। অতঃপর তিনি (সা.) আল্লাহর নিকট যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করবেন, ফলে তাকে অনুমতি দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ আল্লাহর সমীপে গিয়ে এমন প্রশংসা করবেন, যে প্রশংসায় আল্লাহ তাআলা খুশি হয়ে যাবেন। অতঃপর সিজদায় পড়বেন আল্লাহ তা’আলা তাকে মাথা উঠাতে বলবেন আর বলবেন, তুমি বল তোমার কথা শুনা হবে। প্রার্থনা কর (যা চাইবে) দেয়া হবে, আর শাফা’আত কর কবূল করা হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন বলবেন, হে প্রভু! আমার উম্মত, আমার উম্মত। অর্থাৎ তাদের ক্ষমা কর তাদের প্রতি রহম কর। আল্লাহ বলবেন, যাও তোমার উম্মতের যাদের অন্তরে একটি যবের দানা পরিমাণ ঈমান রয়েছে তাদের জাহান্নাম থেকে বের কর। এভাবে তিনবার শাফা’আত করবেন এবং যার অন্তরে একটি সরিষা দানার ক্ষুদ্রতম অংশ পরিমাণ ঈমানও থাকবে তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করবেন। চতুর্থবার আল্লাহর নবী (সা.) এই জীবনে একবার যারা লা- ইলাহা ইল্লাল্প-হ’ পাঠ করেছে তাদের জন্য সুপারিশের অধিকার প্রার্থনা করবেন। আল্লাহ বলবেন, এ অধিকার আপনার নয় বরং আমার। আমার ‘ইয্যত, মহত্ব, বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের শপথ-যারা লা- ইলা-হা ইল্লাল্লহ পাঠ করেছে আমি নিজেই তাদের জাহান্নাম থেকে বের করব। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং নিজেই জাহান্নাম থেকে তাদের বের করবেন। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এটা আল্লাহ তা’আলার মহত্ব ও নামের মহান মর্যাদার প্রতিশ্রুতি, এ মর্যাদা অন্য কারো থাকতে পারে না। আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমল ছাড়া শুধুমাত্র বিশ্বাসের ভিত্তিতে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ব্যবস্থা আল্লাহ তা’আলার জন্য একান্ত, আর রাসূলুল্লাহ (সা.) ও-এর ক্ষেত্রে শাফা’আতের বিশেষত্বের বিষয়টি বিশ্বাসের সাথে খুব নগণ্য হলেও আমলের শর্তে বিভিন্ন স্তরের মুমিনের বেলায় প্রযোজ্য। অতএব উভয়ের আলাদা-আলাদা বিশেষত্ব সুস্পষ্ট। (মিরকাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড ৫১ পৃ., হা. ৩২২)
মূলত রাসূলুল্লাহ (ছা.) কোন উম্মাতকে অর্থাৎ- তাঁর তথা সুন্নাতের অনুসারী নিজের দলভুক্ত মনে করেন তাই তিনি তাদেরকে জাহান্নামে রাখবেন না। রাসূল (ছা.) বলেন, فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي যে আমার সুন্নাত হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। (বুখারী হা/৫০৬৩, মুসলিম হা/৩৪৬৯) —– কথাটি ব্যাখ্যার্থে নিলাম…. যারা ঈমান রেখে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে তারা জাহান্নামে থাকবে না। আর যারা অনুসরণ করে কেবল তারাই রাসূল (ছা.)-এর উম্মাত। আবার যারা ঈমান রাখবে কিন্তু পাপের কারণে জাহান্নামে যাবে তারাও মুক্তি পাবেন রাসূল (ছা.)-এর শাফায়াতের মাধ্যমে।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন, আমীন।

























