মুমিন বান্দার জন্য আল্লাহর পরীক্ষা অনিবার্য

ইসলামে মানুষের জীবন এক পরীক্ষার ক্ষেত্র। আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্ন পরিস্থিতি, সুখ, দুঃখ, ভয় ও ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করবেন। বিনা পরীক্ষায় কোন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কেননা জান্নাত দুঃখ-কষ্ট দ্বারা ঘেরা রয়েছে।

(ক) দুনিয়াতে প্রকৃত মুমিন বান্দার জন্য পরীক্ষা অনিবার্য।

১. কেবল ঈমান এনেছি বললেই পরীক্ষা ছাড়া কাউকে ছেড়ে দেওয়া হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, اَحَسِبَ النَّاسُ اَنۡ یُّتۡرَكُوۡۤا اَنۡ یَّقُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا وَ هُمۡ لَا یُفۡتَنُوۡنَ ‘মানুষ কি মনে করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে অব্যাহতি দেয়া হবে?’(আনকাবুত ২৯/২)? অপর দিকে রাসূল (সা.) জান্নাতকে দুঃখ-কষ্টের এবং জাহান্নামকে প্রবৃত্তির চাদরে আবৃত দেখেন। বস্তুত: মানুষকে আল্লাহ্ তা’আলা বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। ভাল-মন্দ, ধনী-গরিব, দুঃখকষ্ট, সার্বিক অবস্থায় ফেলে তিনি তাদের পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। ঈমানের গভীরতা অনুযায়ী পরীক্ষার তীব্রতা বাড়ে। মুসআব ইবনু সা’দ (রহঃ) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি (সাদ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। মানুষের মাঝে কার বিপদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়? তিনি বললেনঃ নবীদের বিপদের পরীক্ষা, তারপর যারা নেককার তাদের, এরপর যারা নেককার তাদের বিপদের পরীক্ষা। মানুষকে তার ধর্মানুরাগের অনুপাত অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। তুলনামূলকভাবে যে লোক বেশি ধাৰ্মিক তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি কেউ তার দ্বীনের ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে থাকে তাহলে তাকে সে মোতাবিক পরীক্ষা করা হয়। অতএব, বান্দার উপর বিপদাপদ লেগেই থাকে, অবশেষে তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে, সে যমীনে চলাফেরা করে অথচ তার কোন গুনাহই থাকে না” (তিরমিযী হা/২৩৯৮)।

২. মানুষের সৃষ্টির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো তার কর্মের পরীক্ষা নেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, الَّذِیۡ خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَ الۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَكُمۡ اَیُّكُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَ هُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡغَفُوۡرُ-  “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করে নেন যে, কর্মে তোমাদের মধ্যে কে সর্বোত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।”(মূলক ৬৭/২)। আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন বা যার কল্যাণ চান, তাকেই পরীক্ষার মুখোমুখি করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُ ‏”  “আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দুঃখ-কষ্ট বা বিপদ-আপদে পতিত করেন” (বুখারী হা/৫৬৪৫)।

৩. আল্লাহ বান্দার ওপর এমন কোনো পরীক্ষা চাপান না যা তার সহ্যক্ষমতার বাইরে। আল্লাহ তাআলা বলেন,  “আল্লাহ কোনো সত্তার ওপর তার সাধ্যাতীত কোনো বোঝা অর্পণ করেন না।” (বাক্বারাহ ২/২৮৬)। ছোটখাটো বিপদের মাধ্যমেও আল্লাহ মুমিনের পাপ মুছে দেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, -‏ “‏ مَا يَزَالُ الْبَلاَءُ بِالْمُؤْمِنِ وَالْمُؤْمِنَةِ فِي نَفْسِهِ وَوَلَدِهِ وَمَالِهِ حَتَّى يَلْقَى اللَّهَ وَمَا عَلَيْهِ خَطِيئَةٌ ‏” ‘মুমিন নারী-পুরুষের উপর, তার সন্তানের উপর ও তার ধন-সম্পদের উপর অনবরত বিপদাপদ লেগেই থাকে। সবশেষে আল্লাহ্ তা’আলার সাথে সে গুনাহমুক্ত অবস্থায় মিলিত হয়’ (তিরমিযী হা/২৩৯৯)।

৪. মুমিনের সব অবস্থাই কল্যাণকর। পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ এবং সুখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চমৎকার প্রতিদান রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকর-গুজার করে আর অস্বচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসীবাতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর” (মুসলিম হা/৭৩৯০)।

(খ) পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো পরীক্ষা। যথা-

১. ঈমানের সত্যতা যাচাই : কে মুখে শুধু দাবি করে আর কে অন্তরে বিশ্বাস করে, তা প্রকাশ করা। মুখে স্বীকৃতি, অন্তরে বিশ্বাস ও কর্মে প্রতিফলনের মাধ্যমে ঈমানের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সত্য ও প্রকৃত ঈমানদার বান্দাকে আল্লাহ পরীক্ষা করে জান্নাতে দাখিল করতে চান।

২. বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি : পরীক্ষার মাধ্যমে ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে আল্লাহ মুমিনদের জান্নাতে উচ্চ মাকাম দান করেন। ধৈর্য হ’ল একটি খাজানা এটা অর্জন করা ব্যতীত কেহ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। ধৈর্য, উদারতা ও ধীরস্থিরতা ব্যবতীত কেহ মুমিন মুত্তকী হতে পারবে না। যার ধৈর্য যতবেশী তার জান্নাতের উচ্চ মাকাম ততবেশী।

৩. গুনাহ মাফ : যেকোনো দুঃখ-কষ্ট বা বিপদ-আপদের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার অতীতের ছোটখাটো পাপ মুছে দেন। আবার আমলের মাধ্যমে ছোট ছোট গুণাহ ক্ষমা করেন বা ঝরে যায়। যেমন অযুর পানির সাথে ছোট গুণাহ ঝরে পড়ে এমনকি নখের মধ্যে থেকেও। আর বড় বড় গুণাহ অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে ক্ষমা হয়।

(গ) পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমসমূহ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, وَ لَنَبۡلُوَنَّكُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَ الۡجُوۡعِ وَ نَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَ الۡاَنۡفُسِ وَ الثَّمَرٰتِ ؕ وَ بَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ “অবশ্যই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা, এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর আপনি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন” (বাক্বারাহ ২/১৫৫)। আল্লাহ পরীক্ষার প্রধান মাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছেন। যথা-


(১) ভয় ও আতঙ্ক : জীবন বা ধন-সম্পদের নিরাপত্তাহীনতা। কিন্তু মানুষ এসবের নিরাপত্তা পসন্দ করে। আর আল্লাহ সে কারণেই ভয়-ভীতি ও আতঙ্ক দ্বারা মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন।

(২) ক্ষুধা ও দারিদ্র্য: খাদ্য বা জীবিকার অভাব। কিন্তু মানুষ সদা খাবারে সাচ্ছন্দ্য পসন্দ করে। আর আল্লাহ সে কারণেই ক্ষুধা ও দারিদ্রতা দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন। কেননা মানুষকে শয়তান দারিদ্রতার ভয় দেখায়। আর মানুষ এ ফাঁদে পা দিয়ে পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে।

(৩) সম্পদের ক্ষতি: ব্যবসা বা উপার্জনে বড় লোকসান। কিন্তু মানুষ সম্পদের সার্বিক নিরাপত্তা পসন্দ করে। আর আল্লাহ সে কারণেই সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন। রিযিকে ঘাটতির মাধ্যমে মানুষ নিজেকে সংশোধন করে নেয় অথবা বিপথগামী হয়।

(৪) জীবনের ক্ষতি: প্রিয়জন বা আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু। কিন্তু মানুষ প্রিয়জনের বিয়োগ স্বভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে না এবং এই মৃত্যু পসন্দও করে না। আর আল্লাহ সে কারণেই জীবন নাশের মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন। আর যারা মুমিন বান্দা তারা প্রিয়জনের মৃত্যুতে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে থাকেন।

(৫) ফসলের ক্ষতি: প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপার্জনের উৎসের বিনাশ। কিন্তু মানুষ খাদ্য নিরাপত্তা পসন্দ করে। আর আল্লাহ সে কারণেই ফল ও ফসলের ক্ষতি সাধন করে মানুষর পরীক্ষা নিয়ে থাকেন।

(৬) নেয়ামত প্রদানে : নেয়ামত বা সুখের মাধ্যমে পরীক্ষা মানুষ সাধারণত দুঃখ-কষ্টকেই পরীক্ষা মনে করে। কিন্তু সুখ ও নেয়ামতও একটি বড় পরীক্ষা। সম্পদ, সুস্থতা, ক্ষমতা এবং সুন্দর জীবন দিয়ে আল্লাহ দেখেন বান্দা অহংকারী হয় নাকি শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করে। সফল সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর নেয়ামত প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি সর্বাবস্থায় শুকরিয়া জ্ঞাপন করে।

(ঘ) পরীক্ষায় সফল হওয়ার উপায়আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে মুমিনদের কিছু গুণ অর্জন করতে হয়। যথা-

(১) ধৈর্য বা সবর : বিপদে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা ও সর্বদা শুকরিয়া করা।

(২) তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ : আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা যে, তিনিই এই কষ্ট দূর করবেন। আর এটা মনে করা যে, আল্লাহ কোন বান্দাকে তার সাধ্যের বাহিরে দুঃখ-কষ্ট চাপিয়ে দেন না।  

(৩) দো‘আ ও ইস্তিগফার : বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। সকল অবস্থায় আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে বেশী বেশী দোআ ও ক্ষমা প্রার্থনা মাধ্যমে শুকরিয়া করা।

(৪) নিশ্চয়তা রাখা : এই বিশ্বাস রাখা যে, প্রতি কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে (ইনশিরাহ)। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে অহেতুক কষ্ট দেন না। জান্নাত যেহেতু দুঃখ-কষ্টের চাদরে ঢাকা সেহেতু বান্দাকে দুঃখ-কষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করে জান্নাতের মধ্যে দাখিল করতে চান।

মুমিন বান্দার জীবনে ধৈর্য সবচেয়ে বড় গুণ, এ গুণ যার আছে সে সফলকাম হয়েছে। ধৈর্য হলো কর্মময় স্থিরচিত্ততা ও হতাশামুক্ত সুদৃঢ় মনোবল। মুমিন দৃঢ় মনোবল নিয়ে নিজের কল্যাণ ও স্বার্থ অর্জনের জন্য চেষ্টা করবেন। বিপদে আপদে কখনোই অতীতের ভুলভ্রান্তি নিয়ে হতাশা বা আফসোস করে সময় নষ্ট করবেন না বা মনের মধ্যে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও হতাশার অনুপ্রবেশের দরজা খুলে দিবেন না। বরং যা ঘটার আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটেছে এই বিশ্বাস নিয়ে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং দৃঢ় মনোবল নিয়ে কর্মের পথে এগোতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, أفضل الإيمان الصبر والسماحة ‘সর্বোত্তম ঈমান হ’ল ধৈর্য ও উদারতা’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৪৯৫; ছহীহুল জামি‘ হা/২৭৯৫)।

আল্লাহর পরীক্ষা বান্দাকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং তাকে পরিশুদ্ধ ও শক্তিশালী করার জন্য। বিপদে ধৈর্য ধারণকারী এবং সুখে শুকরিয়া আদায়কারী বান্দার জন্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে মহা পুরস্কার ও জান্নাতের সুসংবাদ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের উপর অবিচল থাকার তাওফীক্ব দান করুন আমীন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

loader-image

Scroll to Top