রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘‘তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও! নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলোর উদাহরণ হল ঐ লোকদের মত যারা কোন মাঠে বা প্রান্তরে গিয়ে অবস্থান করল এবং তাদের প্রত্যেকেই কিছু কিছু করে লাকড়ি (জ্বালানি কাঠ) সংগ্রহ করে নিয়ে এলো। শেষ পর্যন্ত এতটা লাকড়ি তারা সংগ্রহ করল যা দিয়ে তাদের খাবার পাকানো হল। নিশ্চয় নগণ্য ছোট ছোট গুনাহতে লিপ্ত থাকা ব্যক্তিদেরকে যখন সেই নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলো গ্রাস করবে (পাকড়াও করবে) তখন তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে।’’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘‘তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও; কেননা সেগুলো মানুষের কাঁধে জমা হতে থাকে অতঃপর তা তাকে ধ্বংস করে দেয়’’ (আহমদ হা/২২৮০৮, সহীহ আল-জামে’ ২৬৮৬-২৬৮৭)।
হাদীসের ব্যাখ্যা :
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছোটখাটো পাপের ব্যাপারে শিথিলতা দেখানো এবং সেগুলো বেশি পরিমাণে করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন, কারণ এগুলো একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। তিনি এর একটি উদাহরণ দিয়েছেন একদল লোকের কথা, যারা একটি উপত্যকার তলদেশে বসতি স্থাপন করেছিল এবং তাদের প্রত্যেকে একটি করে ছোট লাঠি এনেছিল, যতক্ষণ না তারা তাদের সংগ্রহ করা সমস্ত লাঠি দিয়ে নিজেদের রুটি রান্না করেছিল। আর এই তুচ্ছ পাপগুলো, যদি এর মালিককে তার জন্য জবাবদিহি করতে হয় এবং সে তা থেকে তওবা না করে অথবা আল্লাহ তাকে ক্ষমা না করেন, তবে তা তাকে ধ্বংস করে দেবে।
হাদীসের প্রেক্ষাপট :
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন হুনাইন যুদ্ধ শেষ করে ফিরছিলেন, তখন তিনি মরুভূমির এক জনমানবহীন ধূ ধূ প্রান্তরে যাত্রাবিরতি করেন। সেই স্থানটিতে জ্বালানি কাঠ বা অন্য কিছুই ছিল না। তখন তিনি সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন:”তোমরা যে যেখান থেকে পারো একটি করে কাঠি বা হাড় যা পাও কুড়িয়ে নিয়ে এসো।”সাহাবীরা যখন একে একে ছোট ছোট কাঠি সংগ্রহ করে এক জায়গায় জমা করলেন, দেখা গেল অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে এক বিশাল পাহাড়ের মতো স্তূপ হয়ে গেছে। তখন রাসূল ﷺ সেই কাঠগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে বললেন, “দেখো, যেমনভাবে এই ছোট কাঠিগুলো জমা হয়ে বিশাল আগুনের কুণ্ডলী তৈরি করল, মানুষের ছোট গুনাহগুলোও ঠিক একইভাবে জমা হয়ে তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এরপরে
হাদীসের শিক্ষা :
(১) রাসূল (সা) দৃষ্টান্ত প্রদানের উদ্দেশ্য হলো বোঝাপড়া সহজ করা এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা।
(২) তুচ্ছ বলে বিবেচিত ছোটখাটো পাপের বিরুদ্ধে সতর্ক করা এবং মানুষকে দ্রুত তার প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য আহ্বান জানানো।
(৩) ছোট পাপের কয়েকটি অর্থ রয়েছে। যথা-
(ক) প্রথমত: বান্দার এমন পাপকর্ম, যা সে ছোট মনে করে করে, অথচ তা সর্বশক্তিমান আল্লাহর দৃষ্টিতে বড় পাপ।
(খ) দ্বিতীয়ত: বান্দার এমন ছোট পাপকর্ম, যা সে কোনো পরোয়া না করে এবং তা থেকে তওবা না করে, ফলে এই ছোট পাপগুলো তার উপর জমতে জমতে তাকে ধ্বংস করে দেয়।
(গ) তৃতীয়ত: বান্দার এমন ছোট পাপকর্ম, যা সে কোনো পরোয়া না করে করে, ফলে সেগুলো তার বড় ও ধ্বংসাত্মক পাপে পতিত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সতর্কতা :
এই হাদিসটি বলার মূল কারণ ছিল সাহাবীদের তথা পুরো উম্মতকে একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকে বাঁচানো:
(ক) শয়তানের কৌশল: মানুষ যখন বড় বড় কবিরা গুনাহ থেকে দূরে থাকে, তখন শয়তান তাকে ছোট গুনাহের দিকে প্ররোচিত করে। মানুষ ভাবে, “এটা তো সামান্য ব্যাপার, আল্লাহ মাফ করে দেবেন।”
(খ) হৃদয়ের কালিমা: রাসূলুল্লাহ ﷺ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ছোট গুনাহ বারবার করলে হৃদয়ে কালো দাগ পড়ে যায় এবং একসময় মানুষের বড় গুনাহ করার সাহস বেড়ে যায়।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে লক্ষ্য করে বলেছেন:”হে আয়েশা! আমলসমূহকে ছোট মনে করা (বা ছোট গুনাহ) থেকে বেঁচে থাকো। কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে এর জন্য একজন তলবকারী (হিসাব গ্রহণকারী ফেরেশতা) রয়েছেন।” (মুসনাদে আহমাদ হা/২৪৯৭৪ ও ২৫৯৪৪, সহীহুল জামি‘ হা/ ২৬৮৬)
(গ) ফেরেশতাদের নজরদারি: প্রতিটি ছোট আমল বা গুনাহ রেকর্ড করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা নিযুক্ত আছেন।
(ঘ) অবহেলা পরিহার: বড় গুনাহ থেকে বাঁচতে গিয়ে আমরা যেন ছোট গুনাহকে অবহেলা না করি, কারণ কিয়ামতের দিন ছোট-বড় সবকিছুরই হিসাব দিতে হবে।
(ঙ) সগীরা গুণাহ কবীরা গুণাহে রূপান্তর : সগীরা গুনাহ বার বার করলে তা কবীরা গুনাহে পরিণত হয়। যেমন হযরত ওমর ও ইবনু আববাস প্রমুখ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, لاَ صَغِيْرَةَ فِي الْاِصْرَارِ وَلاَ كَبِيْرَةَ فِي اْلِاسْتِغْفَارِ ‘বারবার সগীরা গোনাহ করলে সেটি আর সগীরা থাকে না এবং ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করলে আর কবীরা গুনাহ থাকে না’ (নববী, শরহ মুসলিম ২/৮৭)। যেমন পরনারীর প্রতি দৃষ্টি দেয়া সগীরা গুনাহ। কিন্তু কেউ কেউ বার বার তাকালে তা কবীরা গুনাহ হয়ে যাবে (ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ফাতাওয়া ১৫/২৯৩)।
মুমিন বান্দা সর্বদা আল্লাহকে ভয় পায়। ছোট ছোট পাপকেই তারা বড় পাপ মনে করে এবং বারংবার তাওবাহ করে থাকে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ছোট ছোট গুণাহ থেকে হেফাযত করো এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করো, আমীন।

























