আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কাজের লোককে প্রতিদিন কতোবার ক্ষমা করবো? তিনি চুপ থাকলেন। লোকটি আবার একই প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ থাকলেন। তৃতীয় বার প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সত্তর বার’ (আবু দাউদ হা/৫১৬৪, তিরমিযী হা/১৯৪৯)।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন যে: “এক ব্যক্তি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমরা একজন বান্দাকে কতবার ক্ষমা করব?” অর্থাৎ: সে যখন কোনো অন্যায় কাজ করে অথবা আমাদের আদেশের বিপরীতে কিছু করে, তখন তাকে কতবার ক্ষমা করা উচিত? “তিনি নীরব থাকলেন,” অর্থাৎ: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নীরব থাকলেন এবং তাকে কোনো উত্তর দিলেন না। বলা হয়: তাঁর এই নীরবতাই ছিল একটি উত্তর; কারণ ক্ষমা ইসলামী আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি বিষয়; এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বলা হয় যে, তিনি এ বিষয়ে ওহীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। অতঃপর তিনি (আঃ) পুনরাবৃত্তি করলেন, অর্থাৎ প্রশ্নকারী, তাঁর কাছে, অর্থাৎ নবী (সাঃ)-এর কাছে, সেই কথাটি, অর্থাৎ এই প্রশ্নটি, এবং তিনি নীরব থাকলেন। অতঃপর যখন তৃতীয়বার হলো, অর্থাৎ যখন লোকটি তৃতীয়বারের মতো তাঁর কাছে প্রশ্নটি পুনরাবৃত্তি করল, তখন নবী (সাঃ) তাকে উত্তর দিলেন, এই বলে: “প্রতিদিন তাকে সত্তর বার ক্ষমা করে দাও।” এই সংখ্যাটি প্রাচুর্যের জন্য, সংখ্যার শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর জন্য নয়। এটি বান্দাকে ক্রমাগত ক্ষমা করার একটি রূপক, যার মাধ্যমে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা হয় এবং শাসন করা হয়। এটি তাঁর উম্মতের প্রতি তাঁর করুণা ও দয়ার প্রকাশ, আল্লাহ তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করুন।
যার আমল নামায় সবচেয়ে বেশী ইস্তেগফার যোগ হবে, কেবল সেই ব্যক্তিই দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দিনে রাতে ৭০ বার, অন্যত্র বলেন, ১০০ বার ক্ষমা প্রার্থনা করবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, وَاللهِ إِنِّيْ لَأَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سبعيْنَ مرَّةً. ‘আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই আমি দিনে সত্তর বারেরও বেশী আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই এবং তাঁর নিকট তওবা করি’ (বুখারী, মিশকাত হা/২৩২৩)। অন্যত্র এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, تُوْبُوْا إِلَى اللهِ فَإِنِّيْ أَتُوْبُ إِلَيْهِ فِى الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ- ‘তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা কর। কেননা আমি দৈনিক একশতবার তাঁর নিকট তওবা করি’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২৩২৫)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,يَا عِبَادِيْ إِنَّكُمْ تُخْطِئُوْنَ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعًا فَاسْتَغْفِرُوْنِيْ أَغْفِرْ لَكُمْ- ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা অপরাধ করে থাক রাতে-দিনে। আমি সমস্ত অপরাধ মাফ করে দেই। সুতরাং তোমরা আমার নিকট ক্ষমা চাও, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিব’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২৩২৬)।
তিনি আরো বলেন,فَإِنَّ الْعَبْدَ إِذَا اعْتَرَفَ ثُمَّ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ- ‘যখন বান্দা গোনাহ স্বীকার করে এবং অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে ক্ষমা চায় আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৩৩০)।
অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন,إنَّ الله تَعَالَى يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوْبَ مُسِيْئ النَّهَارِ، ويَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوْبَ مُسِيْئ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا- ‘আল্লাহ তা‘আলা রাতে স্বীয় হাত প্রসারিত করেন, যাতে দিনের গোনাহগার যারা তারা তওবা করে। আবার দিনের বেলায় হাত প্রসারিত করেন যাতে রাতের গোনাহগার ব্যক্তিরা তওবা করে। এভাবে তিনি ক্ষমার হাত প্রসারিত করতে থাকবেন পশ্চিম দিকে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২৩২৯)।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘‘আমি ঐ ব্যক্তিকে জানি যে, সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশ করবে ও সর্বশেষে জাহান্নাম হতে বের হবে। সে হবে ঐ ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে যার ছোট ছোট পাপগুলো তুলে ধরা হবে আর বড় বড় পাপগুলি একদিকে রেখে দেওয়া হবে। তাকে বলা হবে, ‘তুমি অমুক অমুক দিনে অমুক অমুক পাপ করেছিলে?’ সে স্বীকৃতিবাচক জবাব দেবে এবং অস্বীকার করার কোন ক্ষমতা তার থাকবে না। তাছাড়া সে এই ব্যাপারেও ভয় পাবে যে, এক্ষনি তার বড় বড় পাপগুলি তুলে ধরা হবে। এমতাবস্থায় বলা হবে, ‘যাও! তোমার প্রত্যেক পাপের বদলে এক একটি নেকী।’ আল্লাহর এই দয়া দেখে সে বলবে, ‘এখনও তো আমি আমার অনেক আমল দেখছি না।’’ এই কথা বলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হেসে ফেললেন, এমনকি তার দাঁত দেখা গেল। (মুসলিম)
মহান আল্লাহর বাণী, إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ (অন্তর থেকে) তাওবাকারী ও ( দৈহিকভাবে) পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন’ (বাক্বারহা ২/২২২)। অন্যত্র বলেন, আর বলেছি, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল’। ‘তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন,। ‘আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদী-নালা’ (নূহ ৭১/১০-১২)।
উমার (রাঃ)ও একদা ইস্তিসক্বার নামাযের জন্য মিম্বরে আরোহণ করে কেবলমাত্র ইস্তিগফারের আয়াতগুলি (যাতে এই আয়াতও ছিল) পড়ে মিম্বর হতে নেমে গেলেন এবং বললেন, বৃষ্টির সেই পথসমূহ থেকে বৃষ্টি কামনা করেছি, যা আসমানে রয়েছে এবং যেগুলো হতে বৃষ্টি যমীনে বর্ষিত হয়। (ইবনে কাসীর) হাসান বাসরী (রঃ) এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তাঁর কাছে এসে কেউ অনাবৃষ্টির অভিযোগ জানালে, তিনি তাকে ইস্তিগফার করার কথা শিক্ষা দিতেন। আর একজন তাঁর কাছে দরিদ্রতার অভিযোগ জানালে, তাকেও তিনি এই (ইস্তিগফার করার) কথাই বাতলে দিলেন। অন্য একজন তার বাগান শুকিয়ে যাওয়ার অভিযোগ জানালে, তাকেও তিনি ইস্তিগফার করতে বললেন। এক ব্যক্তি বলল যে, আমার সন্তান হয় না, তাকেও তিনি ইস্তিগফার করতে বললেন। যখন কেউ তাঁকে প্রশ্ন করল যে, আপনি সবাইকে কেবল ইস্তিগফারই করতে কেন বললেন? তখন তিনি উপরোক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করে বললেন, ‘আমি নিজের পক্ষ থেকে এ কথা বলিনি, বরং উল্লিখিত সমস্ত ব্যাপারে এই ব্যবস্থাপত্র মহান আল্লাহই দিয়েছেন।’ (ইবন কাসীর; কুরতুবী, আইসারুত তাফাসীর]
এবার বলুন! আল্লাহ তাআলা আমাদের ক্ষমা না করে থাকতে পারেন, তিনি তো সর্বোত্তম ক্ষমাকারী ও দয়ালু। ক্ষমা মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। যারা বেশী বেশী ক্ষমা করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে তারা আল্লাহ নিকট উত্তম ব্যক্তি। আমরা জেনে বুঝে, প্রকাশে অপ্রকাশ্যে নানা প্রকার গুণাহ করে চলেছি। তাই প্রতিদিন প্রতিক্ষণে আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর নিকটে ক্ষমা প্রত্যাশায় ইস্তেগফার পাঠ করা প্রয়োজন। আল্লাহর নিকটে ক্ষমা করিয়ে নিতে পারলেই আপনি দুনিয়া ত্যাগে পরোকালিন জীবনে সফল। আর কোন ভাবেই নিরাশ হবেন না, একশত রহমতের মধ্যে একটি রহমত দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন এখনও তাঁর নিকটে নিরানব্বইটি রহমত রেখে দিয়েছেন। সেই রহমতের প্রত্যাশায় দিনে একশত বার অথবা কমপক্ষে সত্তর বার ইস্তেগফার পাঠ করুন।
তাই আসুন! আমরা ফরয ছালাতের প্রতি যত্নশীল। মহার আল্লাহ আমাদের কবুল করুন, আমীন।

























