ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এখানে এক অতি বিস্ময়কর ‘আসার’ বর্ণনা করেছেন যা আমরা নিম্নে পূর্ণভাবে বর্ণনা করছি। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে,
বানী ইসরাঈলের মধ্যে একজন বিজয়ী লোক ছিল। সে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক ছিল । সে মারা গেলে তার একটি পুত্র তার মালের উত্তরাধিকারী হলো। সে ঐ ধন-সম্পদ বিপথে ও আল্লাহর নাফরমানীর কাজে ব্যয় করতে লাগলো । এ দেখে তার চাচারা তাকে তিরস্কার করলো এবং বুঝাতে লাগলো। এতে সে রাগান্বিত হয়ে তার সমুদয় জিনিসপত্র ও জমিজমা বিক্রি করে দিলো এবং টাকা পয়সা নিয়ে সেখান থেকে চলে আসলো এবং আইনায়ে জাজাহ নামক স্থানে এসে একটি প্রসাদ নিৰ্মাণ করলো। অতঃপর সেখানে বসবাস করতে শুরু করলো।
একদা ভীষণ ঝড়-তুফান শুরু হলো এবং ঐ ঝড়ে এক পরমা সুন্দরী মহিলা তার প্রাসাদে এসে পড়লো । মহিলাটি তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “আপনি কে?” সে উত্তরে বললোঃ “আমি বানী ইসরাঈলের একজন লোক।” মহিলাটি পুনরায় জিজ্ঞেস করলোঃ “এই প্রাসাদ এবং ধন-দৌলত কি আপনার?” সে জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ।” মহিলাটি আবার প্রশ্ন করলোঃ “আপনার স্ত্রী আছে কি?” সে উত্তরে বললোঃ “না।” মহিলাটি বললোঃ “তাহলে জীবনের কি স্বাদ আপনি উপভোগ করছেন?” সে তখন মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার কি স্বামী আছে?” সে জবাব দিলোঃ “না।” সে বললোঃ “তাহলে তুমি আমাকে স্বামী হিসেবে কবূল করে নাও?”
মহিলাটি বললো, “আমি এখান থেকে এক মাইল দূরে অবস্থান করি । আগামীকাল আপনি পুরো একদিনের খাবার সাথে নিয়ে আমার ওখানে আসুন ৷ পথে বিস্ময়কর কিছু দেখলে ভয় পাবেন না।”
সে এটা স্বীকার করে নিলো । পরের দিন খাদ্য সাথে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়লো। এক মাইল পথ চলার পর সে একটি বিরাট অট্টালিকা দেখতে পেলো। দরযায় করাঘাত করলে একটি যুবক বেরিয়ে আসলো এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “তুমি কে?” সে জবাব দিলোঃ “আমি ‘বানী ইসরাঈলের এক লোক।” যুবকটি জিজ্ঞেস করলোঃ “কি কাজে এসেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “এই বাড়ীর মালিকা আমাকে ডেকেছেন।”
যুবকটি প্রশ্ন করলো, “পথে বিস্ময়কর ও ভয়াবহ কিছু দেখেছো কি?” সে জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ, যদি আমাকে ‘ভয় করবে না’ একথা বলা না হতো, তবে আমি ভয়ে ধ্বংসই হয়ে যেতাম। আমি চলতে চলতে এক প্রশস্ত রাস্তায় পৌঁছি। দেখি যে-,
(১) একটি কুকুরী হা করে আছে। আমি ভয় পেয়ে দৌড়াতে শুরু করি । তখন দেখি যে, সে আমার আগে আগে দৌড়াচ্ছে এবং বাচ্চা তার পেটে ঘেঁউ ঘেঁউ করছে।”
= ঐ যুবকটি একথা শুনে বললো, “তুমি একে পাবে না। এটা তো শেষ যুগে ঘটবে। এমনই দৃষ্টান্তমূলক একটি ঘটনা তোমাকে দেখানো হয়েছে। একজন যুবক বৃদ্ধ ও মুরুব্বীদের মজলিসে বসবে এবং নিজের গোপনীয় কথা তাদের কাছে খুলে বলবে।”
ঐ লোকটি বলতে থাকলো, “আমি আরো অগ্রসর হলাম । দেখলাম যে-
(২) একশটি বকরী রয়েছে যাদের স্তন দুধে পূর্ণ রয়েছে। আর একটি বাচ্চা রয়েছে, যে দুধ পান করছে । যখন দুধ শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং সে জানতে পারছে যে, দুধ আর নেই তখন হা করে থাকছে, যেন সে আরো চাচ্ছে।”
= যুবকটি বললো, “তুমি তাকেও পাবে না। এটা তোমাকে একটি উপমা হিসেবে দেখানো হয়েছে ঐ বাদশাহদের যারা শেষ যুগে বাদশাহী করবে। তারা জনগণের ধন-দৌলত সোনা-চাঁদি ছিনিয়ে নিবে। যখন তারা জানতে পারবে যে, জনগণের কাছে আর কিছুই নেই, তখনও তারা অত্যাচার করবে ও হা করে থাকবে।”
লোকটি আরো বললো, “আমি আরো সামনে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম যে-
(৩) একটি খুব সুন্দর রঙ এর তাজা গাছ রয়েছে। গাছটির গঠনও খুব সুন্দর। আমি গাছটির ডাল ভেঙ্গে নেয়ার ইচ্ছা করলে অন্য গাছ হতে শব্দ আসলো, ‘হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার ডাল ভেঙ্গে নাও।’ প্রত্যেক গাছ হতেই এরূপ শব্দ আসতে থাকলো।”
= দারোয়ান যুবকটি বললো, “তুমি তাকেও পাবে না। এতে এর ইঙ্গিত রয়েছে যে, শেষ যামানায় পুরুষের সংখ্যা হবে কম এবং নারীর সংখ্যা হবে বেশী। যখন একজন পুরুষের পক্ষ হতে কোন নারীর নিকট বিয়ের প্রস্তাব যাবে তখন দশ বিশজন নারীর প্রত্যেকেই তাকে নিজের দিকে আহ্বান করবে।”
লোকটি বলতেই থাকলো, “আমি আরো সামনের দিকে অগ্রসর হলাম। দেখলাম যে-
(৪) একটি লোক নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে এবং পানি ভরে ভরে লোকদেরকে পান করাচ্ছে। অতঃপর সে নিজের মশকে পানি ঢালছে। কিন্তু এক ফোঁটা পানিও তাতে থাকছে না।”
= যুবকটি বললো, “এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, শেষ যুগে এমন আলেম ও বক্তাদের আবির্ভাব ঘটবে যারা লোকদেরকে ইলম শিক্ষা দিবে, ভাল কথা তাদেরকে বলবে। কিন্তু নিজে আমল করবে না। বরং পাপে জড়িয়ে পড়বে।”
লোকটি বললো, “আমি আরো সামনে অগ্রসর হলাম। দেখলাম যে-
(৫) একটি বকরী রয়েছে। কেউ তার পা ধরে আছে, কেউ শিং ধরে আছে, কেউ ধরে আছে লেজ, কেউ তার উপর সওয়ার হয়ে আছে এবং কেউ তার দুধ দোহন করছে।”
= যুবকটি বললো, “এটি হলো দুনিয়ার উপমা। যে তার পা ধরে আছে সে দুনিয়া হতে পড়ে গেছে। সে দুনিয়া লাভ করতে পারেনি। যে তার শিং ধরে আছে সে কোনমতে জীবন যাপন করে বটে, কিন্তু অভাব অনটনের মধ্যে থাকে । যে তার লেজ ধরে আছে তার থেকে দুনিয়া পালিয়ে যাচ্ছে। আর যে তার উপর সওয়ার হয়ে আছে সে হলো ঐ ব্যক্তি যে স্বয়ং দুনিয়া পরিত্যাগ করেছে। তবে হ্যাঁ, দুনিয়া হতে উপকার গ্রহণকারী হলো ঐ ব্যক্তি যাকে তুমি ঐ বকরী হতে দুধ দোহন করতে দেখেছো । সে আনন্দিত হোক। সে মুবারকবাদ পাওয়ার যোগ্য।”
লোকটি বললো, “আমি আরো আগে চললাম। দেখি যে-
(৬) একটি লোক কূপ হতে পানি উঠাচ্ছে এবং একটি চৌবাচ্চায় ঢালছে। ঐ চৌবাচ্চা হতে পানি আবার ঐ কূপে ফিরে যাচ্ছে।”
.= যুবকটি বললো, “এটা হলো ঐ ব্যক্তি, যে ভাল কাজ করে কিন্তু তা কবূল হয় না।”
(৭) লোকটি বললো- “আমি আরো আগে এগিয়ে গেলাম । দেখলাম যে, একটি লোক জমিতে বীজ বপন করলো। তৎক্ষণাৎ গাছ হয়ে গেল এবং খুবই উত্তম গম উৎপন্ন হলো।”
= যুবকটি বললো, “এটা হলো ঐ ব্যক্তি যার ভাল কাজগুলো আল্লাহ কবূল করে থাকেন।”
লোকটি বলে চললো, “আমি আরো সামনে অগ্রসর হলাম। দেখলাম যে-
(৮) একটি লোক চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। সে আমাকে বললো, ‘ভাই, আমাকে আমার হাত ধরে তুলে বসিয়ে দাও। আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি সৃষ্টি হয়েছি, কখনো বসিনি।’ আমি তার হাত ধরা মাত্রই সে দাঁড়িয়ে গিয়ে ছুটে পালালো। শেষ পর্যন্ত সে আমার দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেল।”
= যুবকটি বললোঃ “এটা তোমার আয়ু ছিল যা চলে গেছে ও শেষ হয়ে গেছে। আমি মালাকুল মাউত (মৃত্যুর ফেরেশতা)। যে মহিলাটির সাথে তুমি দেখা করতে এসেছো ঐ চেহারায় আমিই ছিলাম। আল্লাহর নির্দেশক্রমে তোমার কাছে গিয়েছিলাম । আমি তোমার রূহ এখানে কবজ করবো ও তোমাকে জাহান্নামে পৌঁছিয়ে দিবো।” এ ব্যাপারেই, এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়-
وَحِیۡلَ بَیۡنَہُمۡ وَبَیۡنَ مَا یَشۡتَہُوۡنَ کَمَا فُعِلَ بِاَشۡیَاعِہِمۡ مِّنۡ قَبۡلُ ؕ اِنَّہُمۡ کَانُوۡا فِیۡ شَکِّۢ مُّرِیۡبٍ-
তাদের ও তাদের কামনা-বাসনার মাঝে অন্তরাল করে দেওয়া হলো, যেমন ইতিপূর্বে তাদের সমপন্থীদের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল। নিশ্চয় তারা ছিল বিভ্রান্তিকর সন্দেহের মধ্যে’ (সূরা সাবা ৩৪/৫৪)।
(হাদীসিট খুবই দুর্বল। তবে চিন্তা ভাবনা করার অবকাশ রয়েছে। তাফসীর ইবনে কাসীর ১৬তম খণ্ড, সূরা সাবা’র ৫৪ নং আয়াতের বর্ণিত তাফসীর)

























